দুর্বল ভারত মহাসাগরের ডাইপোল, এ বছর এল নিনোর দাপটে কি শুকোবে ভারতের কৃষিক্ষেত্র?

ভারতে বর্ষার মরসুম শুরু হতেই নতুন করে উদ্বেগের মেঘ জমছে আবহবিদদের কপালে। প্রতি গ্রীষ্মে সূর্যের প্রখর তাপে ভারতীয় উপমহাদেশ যখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, তখন ভারত মহাসাগর থেকে আর্দ্র বায়ু স্থলভাগের দিকে ছুটে আসে। দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বয়ে আসা এই মৌসুমি বায়ুই ভারতের বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। দেশের মোট উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ৫৬ শতাংশই এই বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। তবে এ বছর প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলস্রোত বা ‘এল নিনো’ ভারতের এই স্বাভাবিক বর্ষাচক্রকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বর্ষার পথে প্রধান অন্তরায় এল নিনো
কয়েক বছর অন্তর প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ জল দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে ফিরে আসে এবং মধ্যপ্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানের ভাষায় একেই ‘এল নিনো’ বলা হয়। এই পরিস্থিতি তৈরি হলে বায়ুমণ্ডলের মেঘ তৈরি করার ঊর্ধ্বগামী বায়ুস্তম্ভগুলি প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে সরে যায়, যার ফলে ভারতীয় উপমহাদেশে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা পৌঁছাতে পারে না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৫১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ এল নিনোর বছরেই ভারতে বৃষ্টিপাতের ব্যাপক ঘাটতি দেখা গিয়েছে।
নিষ্ক্রিয় ভারতের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ
সাধারণত এল নিনোর বছরগুলিতে ভারতকে রক্ষা করতে ঢাল হয়ে দাঁড়ায় ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরুকরণ বা ‘ইন্ডিয়ান ওশেন ডাইপোল’ (আইওডি)। এই প্রক্রিয়ায় পূর্ব আফ্রিকার উপকূল সংলগ্ন ভারত মহাসাগরের পশ্চিম দিক উষ্ণ এবং ইন্দোনেশিয়া সংলগ্ন পূর্ব দিক শীতল হয়ে পড়ে। এই ইতিবাচক তাপমাত্রার তারতম্য আর্দ্র বায়ুকে অতিরিক্ত শক্তি দিয়ে ভারতের দিকে টেনে আনে, যা এল নিনোর প্রভাবকে রুখে দিতে সক্ষম। তবে ২০২৬ সালের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ভিন্ন। মে মাসের শেষ সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, আইওডি সূচক রয়েছে মাইনাস ০.৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এবং আগামী শীতের শুরু পর্যন্ত এটি নিরপেক্ষ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে এল নিনোর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো প্রাকৃতিক প্রতিরোধ এ বছর ভারত মহাসাগরে গড়ে উঠছে না।
কৃষিক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপর্যয়
মৌসম ভবনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন মাসে এল নিনো কিছুটা নরম থাকলেও জুলাই ও আগস্টে তা মাঝারি রূপ নেবে এবং সেপ্টেম্বর থেকে এর শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। এই সময়টি ভারতীয় কৃষির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ বর্ষার শুরুতে বোনা ধান, ডাল ও তুলোর মতো খরিফ শস্যগুলি সেপ্টেম্বর মাস নাগাদই পুষ্টি ধারণ করে দানায় রূপান্তরিত হতে শুরু করে। ডাইপোল নিষ্ক্রিয় থাকায় এবং এল নিনো শক্তিশালী হওয়ার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে, যা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামগ্রিক খাদ্য সুরক্ষাকে বড়সড় সংকটের মুখে ফেলবে।