ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, এবার কি দল ভাঙনের মুখে তৃণমূল কংগ্রেস?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে দল ভাঙা এবং নতুন দল গঠনের প্রবণতা কোনো নতুন ঘটনা নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও আদর্শগত সংঘাতের জেরে একাধিক নতুন দল তৈরি হয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন কংগ্রেস ভেঙে অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ‘বাংলা কংগ্রেস’, যা পরে বামপন্থীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনে প্রধান ভূমিকা নেয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে সেই বাংলা কংগ্রেস ভেঙে সুকুমার রায়ের নেতৃত্বে জন্ম নেয় ‘বিপ্লবী বাংলা কংগ্রেস’। ঠিক একইভাবে ১৯৯৮ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘তৃণমূল কংগ্রেস’, যা ২০১১ সালে দীর্ঘ চার দশকের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় আসে। ইতিহাসের এই দীর্ঘ পরিক্রমা প্রমাণ করে যে, রাজ্যে ক্ষমতার সমীকরণ বদলের পেছনে দল ভাঙার রাজনীতি সবসময়ই অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ঋতব্রত বিতর্ক
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না হওয়ায় বর্তমান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তীব্র অসন্তোষ ও বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে। গুঞ্জন উঠেছে, এবার হয়তো খোদ তৃণমূল কংগ্রেসই ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে সম্প্রতি দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে। এর ফলে বিধানসভায় তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ৮০ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭৮-এ। রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী প্রায় ৫০ জন বিক্ষুব্ধ বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় একটি নতুন দল গঠনের তৎপরতা চালাচ্ছেন। একদা বামেদের পোস্টার বয় এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ঋতব্রতর এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের অন্দরে কুণাল ঘোষের মতো নেতারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে একে বড় ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন।
মমতার পাল্টা হুঁশিয়ারি ও রাজনৈতিক প্রভাব
দলের এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। নিজেকে ‘বড় খেলোয়াড়’ হিসেবে দাবি করে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসকে এভাবে ভাঙা সম্ভব নয়। কিছু নেতা বিজেপির প্ররোচনায় এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে, বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের টিকিটের দাবিতে দলবিরোধী কাজে লিপ্ত হচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী সত্যিই নতুন দল গঠনে সফল হয়, তবে তা রাজ্যের শাসক দলের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে এবং এর সরাসরি সুবিধা পেতে পারে বিরোধী দলগুলি। অন্যদিকে, এই ভাঙনের জল্পনা যদি কেবল ফুটনোট হিসেবেই থেকে যায়, তবে তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে আরও শক্তিশালী করবে। আগামী দিনগুলিতে এই অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরেই নির্ভর করছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ভবিষ্যৎ রূপরেখা।