খালি পেটে রাজনীতি নয়, বিধান-জ্যোতির ‘লুচি-কূটনীতি’র ছোঁয়া কুণাল-তাপসের আড্ডায়

খালি পেটে রাজনীতি নয়, বিধান-জ্যোতির ‘লুচি-কূটনীতি’র ছোঁয়া কুণাল-তাপসের আড্ডায়

বাংলার রাজনীতিতে আদর্শের লড়াই চিরকালই তীব্র, তবে সেই তিক্ততার মাঝে সৌজন্যের আবহ এক অনন্য ঐতিহ্য। সম্প্রতি রাজ্য বিধানসভার গেটের সামনে তৃণমূল কংগ্রেসের কুণাল ঘোষ এবং বিজেপি সরকারের মন্ত্রী তাপস রায়ের পারস্পরিক রসিকতা ও আড্ডা রাজনীতির সেই চেনা সৌজন্যের ছবিকেই আরও একবার সামনে নিয়ে এসেছে। দল ভাঙা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের উত্তপ্ত আবহের মধ্যেই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের নেতার এই ‘হঠাৎ দেখা’ মুহূর্তের মধ্যে এক হালকা মেজাজের আবহ তৈরি করে।

ফিরে দেখা ১৯৫২, বিধান-জ্যোতির সেই রসিকতা

সোমবারের এই ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে ফিরিয়ে এনেছে ১৯৫২ সালের এক ঐতিহাসিক স্মৃতি। স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় এবং বিরোধী শিবিরের তরুণ নেতা জ্যোতি বসুর মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই চলছিল। একদিন চৌরঙ্গী এলাকায় গাড়ি চড়ে যাওয়ার সময় বিধান রায় দেখেন, রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন জ্যোতি বসু। ট্রাম ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদ মিছিলে যাচ্ছেন শুনে বিধান রায় স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে রসিকতা করে জ্যোতিবাবুকে গাড়িতে ডেকে বলেছিলেন, “খালি পেটে বিধান রায় আর কংগ্রেসকে হারানো যাবে না। গাড়িতে এসো, খানকয়েক লুচি আছে, দু’জনে মিলে খাই। তারপর তুমি গিয়ে সভায় দাঁড়িয়ে বিধান রায়কে যত ইচ্ছে গালাগালি কোরো!”

বিধানসভার গেটে কুণাল-তাপসের ‘লুচি’র আবদার

সাত দশক আগের সেই ‘লুচি-কূটনীতি’র ছায়াই যেন দেখা গেল কুণাল ঘোষ ও তাপস রায়ের কথোপকথনে। সামনাসামনি হতেই বিজেপি মন্ত্রী তাপস রায় মুচকি হেসে কুণালকে প্রশ্ন করেন, “ধর্মতলায় লোক হয়নি নাকি?” পালটা বাউন্সার দিয়ে তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ বলেন, “তোমরা তো মঞ্চ বাঁধতেই দাওনি!” পুরনো সতীর্থের মুখে এই জবাব শুনে অতীতে সল্টলেকের লড়াই এবং তৃণমূল জমানায় বার বার আদালতের অনুমতি নেওয়ার প্রসঙ্গ মনে করিয়ে দেন তাপস রায়।

তীব্র রাজনৈতিক বাদানুবাদের মধ্যেই মুহূর্তের মধ্যে আবহ বদলে যায় সৌহার্দ্যে। তাপস রায়ের কাঁধে হাত দিয়ে কুণাল ঘোষ মনে করিয়ে দেন, ছাত্র রাজনীতি থেকেই তাপস রায় তাঁর কলেজের সিনিয়র। আড্ডার শেষ পর্বে কুণাল হাসিমুখে আবদার জুড়ে দিয়ে বলেন, “একদিন খাবার পাওনা রইল। বৌদিকে বোলো, লুচি আর পটল ভাজা পাওনা রইল।” কুণালের এই আবদারে সায় দিয়ে দু’জনে হাসিমুখে হ্যান্ডশেক করেন।

সৌজন্যের রাজনীতি ও এর প্রভাব

চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেখানে দলবদল, সই জাল-কাণ্ড এবং তীব্র কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি নিত্যদিনের ঘটনা, সেখানে দুই যুধান শিবিরের শীর্ষ নেতার এমন ঘরোয়া আড্ডা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মতাদর্শের লড়াই যতই তীব্র হোক না কেন, ব্যক্তিগত স্তরে সৌজন্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা বাংলার রাজনীতির এক সুস্থ ঐতিহ্য। কুণাল-তাপসের এই খোলামেলা আড্ডা দলের কর্মী-সমর্থকদের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা দেয় যে, রাজনীতির ময়দানের শত্রুতা যেন ব্যক্তিগত সম্পর্কের দেওয়ালে ফাটল না ধরায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *