রাজনৈতিক হাইজ্যাকের অভিযোগে উত্তাল বাংলা, অভিষেককে ইডির তলব

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক চরম নাটকীয় এবং নজিরবিহীন মোড় তৈরি হয়েছে। একদিকে যখন রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙন ও তীব্র বিদ্রোহের জেরে বিধানসভা উত্তাল, ঠিক তখনই নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে পৌঁছাল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সরমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। একই দিনে ৬০ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধী দলনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ এবং তৃণমূলের আরেক নেতা জয়প্রকাশ মজুমদারের গ্রেফতারি রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি ওলটপালট করে দিয়েছে।
একই দিনে জোড়া ধাক্কা, দুয়ারে ইডি এবং দলের অন্দরে বিদ্রোহ
বুধবার বিকেলে ইডির দু’জন আধিকারিক সরাসরি কালীঘাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে হাজির হন। প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তের সূত্রে আগামী ১৫ই জুন তাঁকে সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরার নির্দেশ দিয়ে নোটিস ধরানো হয়েছে। বিধানসভার নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকট সামলাতে অভিষেক যখন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে ব্যস্ত, ঠিক তখনই এই কেন্দ্রীয় তদন্তের চাপ তৃণমূলের ওপর বাড়তি রাজনৈতিক চাপ তৈরি করল।
অন্যদিতে, দলবিরোধী কাজের অভিযোগে তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একদা বিশ্বস্ত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ৬০ জন বিধায়কের স্বাক্ষর সম্বলিত চিঠি স্পিকার রথীন্দ্র বোসের কাছে জমা দেন। বিধানসভায় তৃণমূলের মোট ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনের সমর্থন থাকায় দলত্যাগ বিরোধী আইনের খাঁড়া এড়িয়ে অনায়াসেই দুই-তৃতীয়াংশের গণ্ডি পার করেছে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী। স্পিকারের ঘোষণার পর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভার নতুন বিরোধী দলনেতা, সন্দীপন সাহা ও জাভেদ খানকে সহকারী বিরোধী দলনেতা এবং আখরুজ্জামানকে চিফ হুইপ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ক্ষোভের কেন্দ্রে অভিষেক ও আইপ্যাক, ধর্মসংকটে মমতা
বিদ্রোহী শিবিরের মূল লক্ষ্য যে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোণঠাসা করা, তা তাঁদের বক্তব্যেই স্পষ্ট। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিস্ফোরক দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেসকে আসলে ‘আইপ্যাক’ (I-PAC) হাইজ্যাক করেছে এবং দল এখন আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণে নেই। ক্ষুব্ধ বিধায়কদের অভিযোগ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ‘কর্পোরেট কায়দায়’ দল চালাচ্ছেন। বিদ্রোহী গোষ্ঠী জানিয়েছে, তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মানলেও, দলীয় রাশ অভিষেক ও আইপ্যাকের হাত থেকে মুক্ত করতে চান।
এই বিদ্রোহের জেরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন চরম ধর্মসংকটে পড়েছেন। সম্প্রতি নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলীয় জনসভায় ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৮ জন প্রবীণ নেতার উপস্থিতি এই বিদ্রোহের গভীরতা প্রমাণ করে। তৃণমূল নেতৃত্ব অবশ্য ঋতব্রত ও সন্দীপনের এই পদক্ষেপকে অনৈতিক ও নিয়মবিরুদ্ধ বলে দাবি করেছে এবং এর বিরুদ্ধে আইনি পথে হাঁটার প্রস্তুতি শুরু করেছে।
আইনি লড়াই ও জয়প্রকাশ মজুমদারের গ্রেফতারি
বিধানসভার এই টানটান উত্তেজনার মধ্যেই সল্টলেকের একটি ফ্ল্যাট বেআইনিভাবে দখল করে রাখা এবং শ্লীলতাহানির গুরুতর অভিযোগে বিধাননগর উত্তর থানার পুলিশ গ্রেফতার করেছে তৃণমূল নেতা জয়প্রকাশ মজুমদারকে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাট আঁকড়ে রাখার এই ঘটনা সল্টলেক এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
একদিকে ইডির আইনি তৎপরতা, অন্যদিকে জয়প্রকাশ মজুমদারের গ্রেফতারি এবং বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়কের বিদ্রোহ—সব মিলিয়ে তৃণমূলের অন্দরে এই ফাটল ও ক্ষমতার রাশ ধরে রাখার লড়াই আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।