‘কে অভিষেক? ওকে চিনি না তো’! একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগে বিস্ফোরক তৃণমূলেরই জাভেদ

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ছাব্বিশের ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে চলা নজিরবিহীন বিদ্রোহ এবার আরও চরম রূপ নিল। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৬০ জন বিধায়ক সমান্তরাল পরিষদীয় দল গঠন করে দল ‘হাইজ্যাক’ করার পর, এবার সরাসরি দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে নস্যাৎ করলেন কসবা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী জাভেদ আহমেদ খান। একই সঙ্গে দলের দীর্ঘদিনের একনায়কতন্ত্র ও প্রবীণ নেতাদের কোণঠাসা করে রাখার নীতি নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করেছেন তিনি।
অভিষেকের অস্তিত্ব ও নেতৃত্বকে সরাসরি অস্বীকার
তৃণমূলের নবগঠিত পরিষদীয় দলের অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়ে কসবার প্রবীণ বিধায়ক জাভেদ আহমেদ খান সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তীব্র কটাক্ষ ছুড়ে বলেন, “কে অভিষেক? কে সেটা? কই, চিনি না তো! আমি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিনিই না।” তিনি স্পষ্ট জানান যে, তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন এবং আজও চান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের পরামর্শদাতা হিসেবে থাকুন। তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কোনো অগণতান্ত্রিক নেতার ছড়ি ঘোরানো তাঁরা আর বরদাস্ত করবেন না। এর আগে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিধানসভায় অভিষেকের গুরুত্বহীনতার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন যে, পরাজয়ের পর যাঁর বাড়ির সামনে ‘চোর চোর’ স্লোগান ওঠে এবং যিনি ২৬ দিন সাধারণ মানুষের সামনে আসার সাহস পান না, তাঁকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই।
দল ছিল একনায়কতন্ত্রের কবলে, ক্ষোভ প্রাক্তন মন্ত্রীর
দলের অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ উগরে দিয়ে জাভেদ খান দাবি করেন, বিগত দিনে তৃণমূলে কোনো ন্যূনতম গণতন্ত্র ছিল না। দলে থাকা আর না থাকা সমান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাঁর কথায়, “দলের ভেতরে আমাদের কথা বলার কোনো অধিকার ছিল না। বিধায়ক বা মন্ত্রী হয়েও আমাদের প্রতিনিয়ত কোণঠাসা করে রাখা হতো। এমনকি নিজে মন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও একবার দলনেত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেতাম না, দলটা এভাবেই চলত।” তিনি সাফ ঘোষণা করেন যে, তাঁরা এখনও নিজেদের তৃণমূলেরই অংশ মনে করেন, তবে এবার থেকে দলটাকে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চালানো হবে এবং কোনো একনায়কতন্ত্র চলবে না।
কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৮ সালে ১ জানুয়ারি গঠিত হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর মাত্র এক মাসের মধ্যে এই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার নেপথ্যে রয়েছে দলটির অন্দরের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। সিনিয়র নেতাদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জোর করে অভিষেককে দলের ‘নম্বর টু’ বানানোর পর থেকেই পতনের বীজ বপন করা হয়েছিল। আইপ্যাক (I-PAC)-এর মতো সংস্থাকে কাজে লাগিয়ে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতাদের গুরুত্বহীন করে দেওয়া এবং একের পর এক ভুল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে দলটিকে। জাভেদ খানের এই প্রকাশ্য বিদ্রোহ প্রমাণ করে দিল যে, তৃণমূলের নতুন পরিষদীয় দল গঠন কোনো সাময়িক ক্ষোভ নয়, বরং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার এক পরিকল্পিত কৌশল। এর প্রভাবে আগামী দিনে দলের বাকি বিধায়ক ও সাংসদদের ওপর থেকে অভিষেকের নিয়ন্ত্রণ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আরও জোরালো হলো।