দিল্লিতে শুভেন্দু-ঋতব্রতর কাকতালীয় সাক্ষাৎ! বদলে গেল তৃণমূলের ‘ঋতু’

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে যে ভাঙন শুরু হয়েছিল, তা এবার এক চরম ও নজিরবিহীন সংকটের রূপ নিল। দলনেত্রী নিজে পরাজয় স্বীকার না করলেও দলের অন্দরে রক্তক্ষরণ যে আটকানো যায়নি, তা বুধবার হাতেনাতে প্রমাণিত হলো। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দিল্লিতে এক ‘কাকতালীয়’ মোলাকাতের রেশ ধরে এবার ৬০ জন বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে বিধানসভায় হাজির হলেন উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে খাতায়-কলমে নেত্রী মানলেও কার্যত গোটা দলটাকেই হাইজ্যাক করে নিজের উদ্যোগে নতুন পরিষদীয় দল গঠন করে ফেলেছেন তিনি। এর ফলস্বরূপ, স্পিকার বাধ্য হয়ে তাঁর হাতেই তুলে দিয়েছেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতার (LOP) ঘরের চাবি।
বঙ্গভবনের সেই ৪০ সেকেন্ডের মোলাকাত
এই নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূত্রপাত হয়েছিল গত ২২ মে দিল্লির বঙ্গভবনে। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করতে দিল্লি যান, তখন বঙ্গভবনেই ঋতব্রতর সঙ্গে তাঁর আচমকা দেখা হয়। সেই সাক্ষাতের মুহূর্তটি স্মরণ করে ঋতব্রত জানান, “আমি যখন সেখানে ছিলাম, হঠাৎ একটি কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম— ‘আপনি কি বঙ্গভবনে থাকছেন, বিধায়ক স্যার?’ তাকিয়ে দেখি খোদ মুখ্যমন্ত্রী দাঁড়িয়ে। তিনি আমাকে অভিবাদন জানালেন, আমিও উত্তর দিলাম। আমি জানাই, আমি বাংলো খালি করতে ও সংসদীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এসেছি। তখন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তিনি বিরোধী দলের সমস্ত বিধায়কদের প্রশাসনিক বৈঠকে ডাকছেন এবং আমাকেও সেখানে আসতে বলেন। আমি রাজি হই।” মাত্র ৪০ সেকেন্ডের এই কথাবার্তাকে কেন্দ্র করে ঋতব্রতর বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জল্পনা ছড়ালেও, তিনি তা অস্বীকার করেন। তবে এই সাক্ষাতের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ৬০ জন বিধায়ককে নিয়ে তাঁর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করল যে, রাজনীতিতে কোনো সংযোগই কৌশল ছাড়া ঘটে না।
তৃণমূলের অন্দরে চরম রক্তক্ষরণ ও অভিষেকের দূরত্ব
নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে তীব্র অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা একের পর এক দলীয় বৈঠকে বিধায়ক, সাংসদ থেকে শুরু করে কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতির সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছিল। দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে যখন ‘চোর চোর’ স্লোগান উঠছিল এবং রাস্তাঘাটে ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছিল নেতাদের, তখন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পাশে দাঁড়ানোর পরিবর্তে দূরত্ব বাড়াতে শুরু করেন অধিকাংশ বিধায়ক। এই পরিস্থিতির পূর্ণ ফায়দা তুলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দলের সিংহভাগ বিধায়ককে নিজের পক্ষে টানতে সক্ষম হন।
কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই নজিরবিহীন ভাঙন এবং ঋতব্রতর নেতৃত্বে সমান্তরাল পরিষদীয় দল গঠন আসলে দলটির অন্দরে দীর্ঘদিনের একনায়কতন্ত্র ও সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিপর্যয়ের অবধারিত ফল। এর সম্ভাব্য প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে। ৬০ জন বিধায়ক নিয়ে ঋতব্রত বিরোধী দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় বিধানসভার ভেতরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ একপ্রকার শূন্য হয়ে গেল। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কৌশলগত নমনীয়তা ও বিরোধী বিধায়কদের কাছে টানার নীতি বর্তমান শাসক শিবিরকে আরও সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেল। বিধানসভার অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই তৃণমূলের এই ঐতিহাসিক ভাঙন দলটিকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিল।