দলনেত্রীর মস্ত ভুল, দুর্নীতি রুখতে কঠোর হননি মমতা! তৃণমূলের ঐতিহাসিক ভাঙনের পরই বাবুলের বিস্ফোরক পোস্ট

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ৬০ জন বিধায়ক দল ‘হাইজ্যাক’ করে সমান্তরাল পরিষদীয় দল গঠনের জেরে যখন তৃণমূলের অস্তিত্ব খাদের কিনারায়, ঠিক তখনই জোড়াফুল শিবিরে আছড়ে পড়ল আরও এক বড়সড় রাজনৈতিক বোমা। এবার সরাসরি দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়। বুধবার গভীর রাতে ফেসবুকে করা তাঁর একটি দীর্ঘ ও বিস্ফোরক পোস্টকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে।
‘দিদি নিশ্চিত ভাবেই একটি গুরুতর ভুল করেছিলেন’
তৃণমূলের এই শোচনীয় অবস্থার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নরম নীতি’কেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বাবুল সুপ্রিয়। দুর্নীতি প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, “দিদি নিশ্চিত ভাবেই একটি গুরুতর ভুল করেছিলেন। ক্ষমতায় আসার প্রথম দিন থেকেই যারা দুর্নীতি, জনসাধারণের অর্থ তছরুপ এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে শুরুতেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি বলেই পরিস্থিতি আজ এতখানি জটিল হয়েছে।” বাবুলের দাবি, শুরুতেই শক্ত হাতে রাশ না ধরার কারণে দলের একাংশের নেতারা দিনের পর দিন সাধারণ মানুষের টাকা আত্মসাৎ করার ছাড়পত্র পেয়ে গিয়েছিলেন, যার খেসারত আজ দলকে দিতে হচ্ছে।
‘দল ছাড়লে বিধায়ক-সাংসদ পদও ছাড়া উচিত’
ঋতব্রতর নেতৃত্বে ৬০ জন বিধায়কের বিদ্রোহ ও দলত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে তাঁদের নৈতিকতা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন বাবুল। নিজের অতীতের বিজেপি ছাড়ার উদাহরণ টেনে তিনি লেখেন, “কোনো রাজনৈতিক দলের টিকিট, প্রতীক ও নেতৃত্বের ভিত্তিতে নির্বাচনে জিতে আসার পর যদি কেউ সেই দল ছেড়ে যান, তাহলে তাঁর সাংসদ বা বিধায়ক পদও অনতিবিলম্বে ছেড়ে দেওয়া উচিত। আপনি নিজের দলের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে পারেন, আমিও অতীতে তা করেছি। কিন্তু সেই অবস্থানকে সম্মান জানাতে হলে পদ থেকেও সরে দাঁড়ানো উচিত।” তিনি আরও দাবি করেন, অতীতে দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিতর্কিত বলে পরিচিত বহু নেতাই বর্তমানে দল ভেঙে যাওয়া ওই ‘৬০’-এর অংশ হয়ে গিয়েছেন।
মানুষের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ানো ‘সাপ’ কে?
পোস্টের একটি অংশে নাম না করে এক হেভিওয়েট নেতাকে তীব্র আক্রমণ করেছেন বাবুল সুপ্রিয়, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে। তিনি লিখেছেন, “একজন মানুষ আমাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছেন। আমি কখনও ভাবিনি যে একজন সাপ মানুষের ছদ্মবেশে আমাদের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইঙ্গিতটি স্পষ্টতই দল ভাঙানোর মূল কারিগর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা কুণাল ঘোষের দিকেই। একই সঙ্গে বিজেপিকে একপ্রকার সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি লিখেছেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে যেভাবে অন্য দল থেকে আসা নেতাদের বিজেপি দলে নিয়েছে, বাংলায় যেন তারা সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে।
কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
রাজনৈতিক মহলের মতে, তৃণমূলের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রচ্ছন্ন অসন্তোষ জমছিল, নির্বাচনী পরাজয় ও দলের আকস্মিক ভাঙন তা পুরোপুরি প্রকাশ্যে এনে দিল। বাবুল সুপ্রিয়র মতো একজন হেভিওয়েট সাংসদ যখন সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীতিকে ‘ভুল’ বলে দেগে দেন, তখন বুঝতে হবে দলের অন্দরে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কর্তৃত্ব একপ্রকার ধূলিসাৎ হয়েছে। বাবুল এটিকে তাঁর ‘ব্যক্তিগত মতামত’ বলে এড়ানোর চেষ্টা করলেও, এই পোস্টের সম্ভাব্য প্রভাব তৃণমূলের অবশিষ্ট কর্মী-সমর্থকদের মনোবল আরও ভেঙে দেবে। প্রবীণ বিধায়ক জাভেদ খানের পর রাজ্যসভার সাংসদ বাবুলের এই প্রকাশ্য বাগযুদ্ধ প্রমাণ করছে যে, দলটির নিয়ন্ত্রণ এখন সম্পূর্ণভাবে শীর্ষ নেতৃত্বের হাতছাড়া হওয়ার মুখে।