বাম সাম্রাজ্যের পতন থেকে ক্ষমতার অবসান, শেষ হলো তৃণমূলের ২৮ বছরের রাজনৈতিক অধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দীর্ঘ ও নাটকীয় অধ্যায়ের অবসান ঘটল। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি যে দলটির জন্ম হয়েছিল বামফ্রন্টের একচ্ছত্র আধিপত্যকে উপড়ে ফেলার সংকল্প নিয়ে, ২০২৬ সালে এসে সেই সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এক চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয় এবং দলীয় ভাঙনের জেরে আক্ষরিক অর্থেই অবসান ঘটল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক নিয়ন্ত্রিত সেই চেনা তৃণমূলের।
লড়াইয়ের সূচনা ও বাম সাম্রাজ্যের পতন
নব্বইয়ের দশকে তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয়তা এবং বামেদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের তাগিদ থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নতুন দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা মমতা ১৯৮৪ সালে যাদবপুরে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নজর কেড়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে তৃণমূল গঠনের পর ১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচন এবং ২০০০ সালের কলকাতা পুরসভা জয়ের মাধ্যমে বঙ্গে বিকল্প শক্তি হিসেবে দলটির উত্থান ঘটে। ২০০৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না হলেও, সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে ১৮৪টি আসনে জয়লাভ করে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটায় তৃণমূল কংগ্রেস।
ক্ষমতার মধ্যগগন ও আকস্মিক বিপর্যয়
২০১১ সালের পর থেকে বাংলায় কার্যত অপরাজেয় হয়ে উঠেছিল তৃণমূল। ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও রাজ্য থেকে ২৯টি আসনে জয়লাভ করে দলটির আধিপত্য বজায় ছিল। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সমস্ত পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণিত করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের আসনে পরাজিত হন। নির্বাচনের ফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যেই দলটিতে এক নজিরবিহীন ভাঙন ধরে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে সংসদীয় দলের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এবং প্রাক্তন বাম নেতা তথা বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘নতুন তৃণমূল’ আত্মপ্রকাশ করে।
পরাজয়ের কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
তৃণমূলের এই আকস্মিক পতনের নেপথ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া এবং সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক দুর্বলতাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিরোধী শিবিরের আগ্রাসী প্রচার এবং শাসকদলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ পরিবর্তনের ফলে জনমানসে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তা ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়েছে। এই পালাবদলের ফলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ তৈরি হতে চলেছে। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে রাজ্যের মূল চালিকাশক্তি থাকা একটি আঞ্চলিক দলের এভাবে ভেঙে যাওয়া আগামী দিনে রাজ্যের শাসনব্যবস্থা এবং বিরোধী রাজনীতির গতিপ্রকৃতিকে আমূল বদলে দেবে।