দেদার কাটমানি খেয়ে জনরোষের ভয়ে খাটের নিচে তৃণমূল নেতা! উদ্ধার করল পুলিশ

দেদার কাটমানি খেয়ে জনরোষের ভয়ে খাটের নিচে তৃণমূল নেতা! উদ্ধার করল পুলিশ

নিজস্ব প্রতিনিধি, মাথাভাঙা: তৃণমূলের জমানায় একসময় আক্রান্ত হয়ে থানার টেবিলের তলায় পুলিশ কর্মীর লুকিয়ে পড়ার নজির দেখেছিল রাজ্যবাসী। কিন্তু রাজ্যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ক্ষমতা বদল হতেই এবার সম্পূর্ণ উলটপুরাণ! এবার বিক্ষুব্ধ জনতার তাড়া খেয়ে এবং গণধোলাইয়ের ভয়ে নিজের ঘরের খাটের নিচে সেঁধিয়ে গেলেন এক দাপুটে তৃণমূল নেতা। আর এই বেনজির ঘটনার সাক্ষী থাকল কোচবিহারের মাথাভাঙা।

টেবিলের তলা থেকে খাট, ক্ষমতা বদলাতেই উলটপুরাণ

চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটেছে কোচবিহারের মাথাভাঙা-১ ব্লকের জোরপাটকি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, জোরপাটকির ১৩১ নম্বর বুথের পঞ্চায়েত সদস্য বিউটি বিবির স্বামী তথা স্থানীয় তৃণমূল নেতা শহিদুল মিঞার বিরুদ্ধে এলাকায় অভিযোগের পাহাড় জমছিল। ক্ষমতা হারানোর পর বুধবার তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে তুমুল বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন গ্রামের শোষিত ও ক্ষুব্ধ মানুষজন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং গণরোষের হাত থেকে নিজের চামড়া বাঁচাতে সোজা ঘরের খাটের নিচে গিয়ে আশ্রয় নেন ওই নেতা। শেষমেশ মাথাভাঙা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে খাটের তলা থেকে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

সিভিক ভলান্টিয়ার থেকে কোটি টাকার কাটমানি রাজ

এলাকাবাসী সূত্রে খবর, ধৃত শহিদুল মিঞা একসময় পেশায় সিভিক ভলান্টিয়ার ছিলেন। পরবর্তীতে চাকরি খোয়ালেও এলাকায় শাসকদলের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুরোদস্তুর নেতা বনে যান তিনি। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের আবাস যোজনার ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে গরিব গ্রামবাসীদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেদার কাটমানি পকেটে পুরেছেন ওই নেতা। এর আগে কেউ এই কাটমানি রাজের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলে ক্ষমতার চাবুক খাটিয়ে তাঁদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হতো।

বাড়ি লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টি ও ডিমের তাড়া

রাজ্যে রাজনৈতিক হাওয়া বদল হতেই বুধবার আর তর সয়নি জোরপাটকির বাসিন্দাদের। কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গ্রামবাসীরা শহিদুলের বাড়ি ঘেরাও করে ‘চোর চোর’ স্লোগান দিতে থাকেন। উত্তেজিত জনতা নেতার বাড়ি লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু ইটবৃষ্টি এবং ডিম ছুড়তে শুরু করলে এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। জনতার এই রুদ্ররূপ দেখেই একসময়ের ত্রাস শহিদুলের সমস্ত দাপট উবে যায় এবং তিনি খাটের নিচে আত্মগোপন করেন।

কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত জমানায় গ্রামীণ স্তরে আবাস যোজনা বা অন্যান্য সরকারি প্রকল্পে যেভাবে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে কাটমানি খাওয়া হয়েছিল, রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর সাধারণ মানুষের সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। এতদিন যে গরিব মানুষ ভয়ে মুখ খোলেননি, ক্ষমতার হাতবদল হতেই তাঁরা দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের বিরুদ্ধে সরাসরি রুখে দাঁড়াচ্ছেন। এই ঘটনার সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে, জেলার অলিতে-গলিতে অন্যান্য দুর্নীতিগ্রস্ত পঞ্চায়েত স্তরের নেতাদের মধ্যেও তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মাথাভাঙার এই ‘খাটের নিচে লুকানো’র ঘটনা আগামী দিনে উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ রাজনীতিতে তৃণমূলের অবশিষ্ট সাংগঠনিক ভিতকে আরও বড়সড় ধসের মুখে ফেলবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *