মমতাই আসল দল এবং দরকারে নতুন প্রতীক গড়বেন! বিদ্রোহী ও বিজেপির বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মহুয়া মৈত্র

নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: প্রতিষ্ঠার পর গত প্রায় তিন দশকে এমন নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে পড়তে হয়নি ঘাসফুল শিবিরকে। তৃণমূলের অন্দরে চলা এই বেনজির মহাবিদ্রোহের মাঝেই এবার আসরে নামলেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। দল ভাঙানো বিদ্রোহী বিধায়কদের তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তাঁদের ‘সম্পূর্ণ অকেজো’ বলে দাগিয়ে দিয়েছেন তিনি। মহুয়ার সাফ কথা, এতকাল এই নেতারা শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার হাওয়ায় ভেসে টিকে ছিলেন, এখন বিরোধী বেঞ্চে বসে লড়াই করার মতো ন্যূনতম রাজনৈতিক সাহস বা ক্ষমতা এদের আর নেই।
এজেন্সির ভয় ও শুভেন্দুর ব্ল্যাকমেল স্ক্রিপ্ট
একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে মহুয়া মৈত্র সরাসরি অভিযোগ করেছেন, ভয় দেখানো এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে চাপ প্রয়োগের ব্ল্যাকমেইল নীতি নিয়েই বিজেপি এই ভাঙন ঘটিয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার ফলে এই দলত্যাগী নেতারা বিরোধী রাজনীতি করার মানসিকতাই হারিয়ে ফেলেছেন। ইডি, সিবিআই বা পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার সাহস নেই বলেই স্রেফ নিজেদের পিঠ বাঁচাতে তাঁরা বিজেপির পায়ে আত্মসমর্পণ করছেন। এই দলবদলের নেপথ্যে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর হাত রয়েছে দাবি করে মহুয়া বলেন, “শুভেন্দু একসময় তৃণমূলের সৈনিক থাকায় কোন বিধায়কের কোথায় কী দুর্বলতা রয়েছে, তা খুব ভালো করেই জানতেন। সেই অনুযায়ী বেছে বেছে অপারেশন চালানো হয়েছে। মোতাবাড়ির সাবিনা ইয়াসমিনকে এনআইএ-র ভয় দেখানো হয়েছে, আবার জাভেদ খানের মতো প্রবীণদের বলা হয়েছে বেআইনি নির্মাণের জন্য তাঁদের ছেলেদের ধরা হবে। প্রত্যেকের ওপর আলাদা আলাদা ব্ল্যাকমেল স্ক্রিপ্ট সাজানো হয়েছিল।”
দরকারে নতুন পার্টি, তবূও আপস নয়
বিদ্রোহী ৫৮ জন বিধায়ক একজোট হয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলনেতা নির্বাচন করা এবং নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করাকে নস্যাৎ করেছেন মহুয়া। ঋতব্রত ও সুখেন্দুশেখরদের একহাত নিয়ে তিনি গর্জে ওঠেন, “এই লোকগুলো সম্পূর্ণ অকেজো। আজ তারা চাইলে নিজেদের পথে যাক, নিজেদের ‘ঋতব্রত কংগ্রেস’ গড়ুক, যা খুশি করুক। কিন্তু নিজেদের তৃণমূল কংগ্রেস বলবে না।” তিনি স্পষ্ট করে দেন, নির্বাচন কমিশন যদি এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে আসল তৃণমূল হিসেবে স্বীকৃতিও দেয়, তবুও দল ভেঙে পড়ছে না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াইয়ের ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “যিনি শূন্য থেকে নিজের প্রতীক তৈরি করে তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেন, তিনি দরকারে আবার লড়বেন এবং নতুন প্রতীক তৈরি করবেন। ওরা ছবি নিক, প্রতীক নিক, যা খুশি নিক— ওরা কখনও তৃণমূল কংগ্রেস হতে পারবে না।”
ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাব্বিশের নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর থেকেই দলের অন্দরে যে চরম নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছিল, এই মহাবিদ্রোহ তারই পরিণতি। বিদ্রোহীরা মূলত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেও মহুয়া মৈত্র সেই যুক্তিকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছেন। মহুয়ার এই অনমনীয় অবস্থান এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, তৃণমূলের মূল নেতৃত্ব কোনো চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করবে না।
তবে এই রাজনৈতিক সংঘাতের সম্ভাব্য প্রভাব হতে পারে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। একদিকে মহুয়ার এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পর বিদ্রোহী শিবিরের অন্দরে থাকা যেসব বিধায়ক এখনও মমতাকে সর্বোচ্চ নেতা মানতে চান, তাঁদের অবস্থান আরও ডামাডোলের মধ্যে পড়বে। অন্যদিকে, বিরোধী নেতৃত্বকে নিজেদের পছন্দমতো গড়ে তোলার যে ‘বিজেপি ব্লুপ্রিন্ট’-এর অভিযোগ মহুয়া তুলেছেন, তা আগামী দিনে রাজ্য রাজনীতিতে শাসক ও বিরোধী শিবিরের আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে।