১৫ বছরের শাসনের অবসান আর তৃণমূলের ভাঙন! মমতার ভাইপো-প্রীতিই কি ডোবাল বিশাল সাম্রাজ্য?

১৫ বছরের শাসনের অবসান আর তৃণমূলের ভাঙন! মমতার ভাইপো-প্রীতিই কি ডোবাল বিশাল সাম্রাজ্য?

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভাবনীয় পালাবদল ঘটিয়ে পনেরো বছরের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটেছে। তবে বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই শোচনীয় পরাজয়ের চেয়েও রাজনৈতিক মহলকে বেশি বিস্মিত করেছে শাসক দলের তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া। বিশ্লেষকদের মতে, একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের এমন আকস্মিক পতনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অন্ধস্নেহ এবং পরিবারতন্ত্র।

গণতন্ত্রে নির্বাচন হলো জনসমর্থন এবং জনরোষ প্রকাশের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের মূল হাতিয়ার ছিল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু অভিযোগ, ক্ষমতা ধরে রাখতে তারা সেই বাম আমলের ভোট-কৌশল এবং পেশিশক্তিকেই আপন করে নিয়েছিল। রাজ্যে নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে লাগামহীন রাজনৈতিক সন্ত্রাস সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। ভোটাররা শুধু শাসক বদল নয়, বরং এই ‘গুণ্ডা রাজ’-এর অবসান চেয়েই ব্যালট বাক্সে নিজেদের চূড়ান্ত রায় দিয়েছেন।

তবে মানুষের ক্ষোভের পাশাপাশি দলের অভ্যন্তরীণ ভাঙন তৃণমূলের এই পতনের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছে। ভারতের অন্যান্য আঞ্চলিক দলের মতো তৃণমূল কংগ্রেসও শেষ পর্যন্ত ‘পরিবারতন্ত্র’-এর ফাঁদ থেকে বেরোতে পারেনি। উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদব যেমন অখিলেশ যাদবকে এবং বিএসপি নেত্রী মায়াবতী যেমন তাঁর ভাইপো আকাশকে দলের শীর্ষে বসিয়েছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেই একই পথে হেঁটেছেন। দলের অসংখ্য যোগ্য ও পোড়খাওয়া নেতাকে উপেক্ষা করে তিনি যখন ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে অঘোষিত উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেন, তখন থেকেই দলের অন্দরে বিদ্রোহের আগুন জ্বলতে শুরু করে।

অভিষেকের এই উল্কাগতির উত্থান দলের পুরনো নেতাদের চরম হতাশ করেছিল। এই যোগ্যতার অবমূল্যায়ন এবং ভাইপো-প্রীতির কারণেই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মতো একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতারা দল ছাড়তে বাধ্য হন। বিশ্লেষকরা মমতার এই নীরব দর্শক হয়ে থাকার মানসিকতাকে ‘ধৃতরাষ্ট্র কমপ্লেক্স’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, যেখানে অন্ধস্নেহের বশবর্তী হয়ে তিনি নিজের দলের ভাঙন রুখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির এই উত্থান এবং ক্ষমতা দখল প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে যোগ্যতার কদর না হলে তার মাশুল কত ভারী হতে পারে। বর্তমানে রাজ্যে নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করা। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের এই পরিণতি দেশের সমস্ত পরিবারতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এক কঠোর বার্তা রেখে গেল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *