তিন বছরেও নিভল না মণিপুরের আগুন, নতুন করে প্রাণহানি ও রক্তপাতে কাঁপছে রাজ্য!

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে জাতিগত সংঘাত ও দাঙ্গার পরিস্থিতি ক্রমশ আরও জটিল আকার ধারণ করছে। ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যকার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত তিন বছর পার হলেও শান্তির কোনো স্থায়ী সমাধান এখনও অধরা। সাম্প্রতিক কিছু ভয়াবহ ঘটনায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যজুড়ে, যা প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সংঘাত ও প্রাণহানি
চলমান জাতিগত উত্তেজনার মধ্যেই ফের ভয়াবহ রক্তপাতের ঘটনা ঘটল। শুক্রবার কাকভোরে রাজ্যের কাংপোকপি জেলার লয়বল খুল্লেন গ্রামে একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতীর অতর্কিত হামলায় এক নারী-সহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু তাই নয়, এলাকা জুড়ে তাণ্ডব চালিয়ে অন্তত সাতটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় হামলাকারীরা।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই সংঘাতের মাঝে ২০২৬ সালের এপ্রিল ও জুনে নতুন করে চরম সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত ৭ এপ্রিল বিষ্ণুপুর জেলার ত্রংলাওবি এলাকায় এক সন্দেহভাজন বোমা হামলায় দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর ইম্ফল উপত্যকায় তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয় এবং বিক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আরও কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটে।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় ৫ জুন ২০২৬ তারিখে। কাংপোকপি জেলায় ভোরে তিন কুকি গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং বেশ কয়েকটি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কুকি সংগঠনগুলোর দাবি, এই হামলার পেছনে সশস্ত্র চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হাত রয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ
শান্তি ফেরাতে পূর্বতন সরকার ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মণিপুরে রাষ্ট্রপতির শাসন জারি করা হয়েছিল। দীর্ঘ এক বছর পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউমনাম খেমচাঁদ সিংয়ের নেতৃত্বে রাজ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তবে নতুন মুখ্যমন্ত্রী দায়িত্ব নিলেও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সহিংসতা এবং নিরাপত্তাহীনতা অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপত্যকার জেলাগুলোতে ঘন ঘন ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং কার্ফুর মতো কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে প্রশাসন।
নেপথ্যের মূল কারণ
এই সংঘাতের শেকড় লুকিয়ে আছে দীর্ঘদিনের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে। ব্রিটিশ আমলের নীতি অনুযায়ী মণিপুরের ইম্ফল উপত্যকায় মেইতেই সম্প্রদায় এবং চারপাশের পাহাড়ি এলাকায় উপজাতি গোষ্ঠীগুলোর বসবাস নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। রাজ্যের বর্তমান ভূমি আইন অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইরা পাহাড়ি এলাকায় জমি কিনতে পারেন না, কিন্তু কুকি ও নাগা উপজাতিরা উপত্যকায় জমি কিনতে পারেন। এই আইনি বৈষম্য এবং মেইতেই সম্প্রদায়ের ‘তফসিলি উপজাতি’ (এসটি) মর্যাদার দাবিকে কেন্দ্র করেই মূলত ২০২৩ সালে এই ভয়াবহ দাঙ্গার সূত্রপাত ঘটে।
অন্যান্য সম্প্রদায়ের আতঙ্ক
মেইতেই ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যকার এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন রাজ্যে বসবাসকারী প্রায় ৬০ হাজার নেপালিভাষী বা গোর্খা সম্প্রদায়ের মানুষ। সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাদের অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে ইতিমধ্যে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
সব মিলিয়ে মণিপুরের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছে এবং উপদ্রুত এলাকায় দ্রুত স্থায়ী শান্তি প্রক্রিয়ার রূপরেখা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে।