সমুদ্রে তেল আটকালে ডুববে বিশ্ব অর্থনীতি, ইরানের চরম হুঁশিয়ারি কি নতুন যুদ্ধের ইঙ্গিত

সমুদ্রে তেল আটকালে ডুববে বিশ্ব অর্থনীতি, ইরানের চরম হুঁশিয়ারি কি নতুন যুদ্ধের ইঙ্গিত

আমেরিকান অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধের মুখে পড়ে তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ইরান। তেহরান এখন সমস্ত কূটনৈতিক সমঝোতা একপাশে সরিয়ে রেখে একটি ‘মিনি ওয়ার প্ল্যান’ বা সংক্ষিপ্ত যুদ্ধ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। ইরানের সাফ বার্তা, আন্তর্জাতিক সমুদ্রে যদি তাদের তেল আটকে রাখা হয়, তবে তারা বিশ্ব অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেবে। পারস্য উপসাগরসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্য পথগুলো বন্ধ করে দেওয়ার এই হুঁশিয়ারি সমগ্র আরব অঞ্চলে এক ভয়াবহ যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।

অবরোধের জেরে চরম সংকট

দীর্ঘদিন ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরানের প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল তেল ওমান উপসাগরে আটকে রয়েছে। দেশের রিফাইনারিগুলোতে উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও তা মজুত করার ক্ষমতা শেষ হয়ে আসছে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, ইরান ইতিমধ্যে কিছু তেল সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। বেশ কিছু শিপিং কো ম্পা নি শুল্ক দিয়ে হোরমুজ প্রণালী পার হওয়ার চেষ্টা করলেও মার্কিন বাহিনী তাদের পথরোধ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ইরানের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা রয়েছে— আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করা, মার্কিন অবরোধ ভেঙে ফেলা অথবা আরব দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে চাপ সৃষ্টি করা। প্রথম পথটি ইরান কোনোভাবেই মেনে নেবে না, যার অর্থ বাকি দুটি পথই অঞ্চলটিকে এক মারাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ বন্ধের ব্লু-প্রিন্ট

আমেরিকা যদি এই অবরোধ তুলে না নেয়, তবে ইরান পাঁচটি ভিন্ন ফ্রন্টে ব্লকেড বা অবরোধ তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে। এর আওতায় পারস্য উপসাগর, হোরমুজ প্রণালী, ওমান উপসাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালী এবং এডেন উপসাগর সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, হোরমুজ প্রণালীর যে অগভীর অংশ দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল করে, তার জাহাজ চলাচলের লেন এবং বাফার জোন সম্পূর্ণভাবে ইরান ও ওমানের সামুদ্রিক সীমানার মধ্যে পড়ে। তেহরান এখন নতুন কূটনৈতিক ফর্মুলা নিয়ে এসেছে, যেখানে হোরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ কেবল ইরান ও ওমানই নির্ধারণ করবে এবং অন্য কোনো তৃতীয় দেশের হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না।

পাল্টা কৌশল ও ক্ষেপণাস্ত্রের প্রস্তুতি

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে আলোচনার আবহ তৈরি করছেন, অন্যদিকে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে দ্বিমুখী নীতি খেলছেন বলে অভিযোগ ইরানের। এই ছদ্মযুদ্ধের জবাব দিতে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ‘মিশন ৩০০’ নামের একটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইরানের হাতে থাকা খুররমশহর, সেজিল এবং হাইপারসনিক মিসাইল যেকোনো এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে সক্ষম। তেহরান থেকে কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং ইসরায়েলের দূরত্ব অনুযায়ী এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো মাত্র দেড় থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারে।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যদি আরব দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়, তবে সেই দেশগুলো নিজেদের সুরক্ষায় আমেরিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ফলস্বরূপ, মার্কিন প্রশাসন ইরানের সাথে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে আসতে বাধ্য হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রে যে বারুদ জমছে, তা যেকোনো সময় বিশ্ব অর্থনীতি ও শান্তির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *