৪৭ বছর পর লাক্ষাদ্বীপে মিলবে মদ! ৯৭% মুসলিম অধ্যুষিত এই দ্বীপে নিষেধাজ্ঞা তুলল সরকার

৪৭ বছর পর লাক্ষাদ্বীপে মিলবে মদ! ৯৭% মুসলিম অধ্যুষিত এই দ্বীপে নিষেধাজ্ঞা তুলল সরকার

লাক্ষাদ্বীপ আবগারি নীতি: ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে আরব সাগরে অবস্থিত অত্যন্ত সুন্দর দ্বীপ লাক্ষাদ্বীপ ইদানীং এক বড় ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

এই মুসলিম-অধ্যুষিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ১৯৭৯ সাল থেকে অর্থাৎ গত ৪৭ বছর ধরে মদের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা (Liquor Ban) জারি ছিল। তবে এখন কেন্দ্র সরকার একটি বড় পদক্ষেপ নিয়ে এই পুরনো নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে এবং দ্বীপে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে মদ বিক্রির পথ প্রশস্ত করেছে।

নতুন ‘লাক্ষাদ্বীপ আবগারি রেগুলেশন ২০২৬’-এর অধীনে এখন একটি যথাযথ লাইসেন্সিং কাঠামো আনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে মদের উৎপাদন, সংরক্ষণ, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন এবং বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এতদিন শুধু ‘বাঙ্গারাম’-এর মতো নির্দিষ্ট কিছু জনশূন্য দ্বীপে অবস্থিত সরকারি রিসোর্টেই পর্যটকদের জন্য মদের অনুমতি ছিল, কিন্তু এখন এর পরিধি বাড়ানো হচ্ছে।

লাক্ষাদ্বীপে কেন মদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল?

এই নিষেধাজ্ঞার পেছনের গল্পটি এখানকার সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোর সঙ্গে জড়িত। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, লাক্ষাদ্বীপের মোট জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের।

ভারতের যেকোনো রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে এটিই মুসলিম জনসংখ্যার বৃহত্তম অনুপাত। যেহেতু ইসলাম ধর্মে মদ্যপান নিষিদ্ধ, তাই স্থানীয়দের অনুভূতি ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রশাসন ১৯৭৯ সালে এখানে মদের ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। গুজরাট ও বিহারের মতো এখানেও মদ বিক্রি বা পান করা বেআইনি হিসেবে গণ্য হতো।

৪৭ বছর পর কেন নিষেধাজ্ঞা তোলা হলো?

সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো ধর্মীয় এজেন্ডা নেই, বরং এর সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক এবং পর্যটন কেন্দ্রিক কারণ রয়েছে:

  • ‘মালদ্বীপ’কে টেক্কা দেওয়া এবং পর্যটন বাড়ানো: লাক্ষাদ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মালদ্বীপের মতোই। মদের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি পর্যটকরা লাক্ষাদ্বীপের পরিবর্তে মালদ্বীপ, মরিশাস বা সেশেলস বেছে নিতেন। সরকারের লক্ষ্য হলো, বিশ্বমানের পর্যটন গড়ে তুলে মালদ্বীপকে সরাসরি টক্কর দেওয়া।
  • প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফর ও মহা-পরিকল্পনা: ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সফরের পর এই দ্বীপ নিয়ে বিশ্বজুড়ে আগ্রহ তৈরি হয়। ২০২৩ সালেই পর্যটনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার একটি খসড়া তৈরি হয়েছিল, যা এখন ‘লাক্ষাদ্বীপ আবগারি রেগুলেশন ২০২৬’-এর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
  • অন্যান্য দ্বীপের উন্নয়ন: লাক্ষাদ্বীপে মোট ৩৬টি দ্বীপ রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ১০টিতে মানুষের বাস (যেমন আগাত্তি, আমিনি, আন্দ্রোত, কাভারাত্তি এবং মিনিকয়)। সরকারের পরিকল্পনা হলো, নিয়ন্ত্রিত মদ্যপান শুধু একটি দ্বীপে সীমাবদ্ধ না রেখে বাকি জনবসতিপূর্ণ ও জনশূন্য দ্বীপগুলোতেও ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে সেখানে বড় বড় ফাইভ-স্টার রিসোর্ট ও হোটেল গ্রুপ বিনিয়োগ করতে পারে।

পুরো দ্বীপে কি খোলাখুলি মদ মিলবে?

প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, নিষেধাজ্ঞা তোলার অর্থ এই নয় যে সেখানে সাধারণ দোকানের মতো যত্রতত্র মদ পাওয়া যাবে। মদ বিক্রির অধিকার শুধুমাত্র সরকারি কর্পোরেশন এবং নির্বাচিত লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সিগুলোরই থাকবে। স্থানীয় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় যাতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, তার জন্য কঠোর নিয়ম ও নির্দেশিকা তৈরি করা হয়েছে।

সরকার উদাহরণ দিয়ে জানিয়েছে, ভারতের আরেক মুসলিম-অধ্যুষিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু-কাশ্মীরেও মদের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই এবং সেখানে পর্যটন শিল্প অত্যন্ত শক্তিশালী। ঠিক সেই মডেলেই এখন লাক্ষাদ্বীপকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *