মাঝরাতে নাটকীয় গ্রেফতারি, অশোকনগরে সরকারি নথি পোড়ানোর অভিযোগে শ্রীঘরে পুরপ্রধান

মাঝরাতে নাটকীয় গ্রেফতারি, অশোকনগরে সরকারি নথি পোড়ানোর অভিযোগে শ্রীঘরে পুরপ্রধান

রাজ্যের পুর নিয়োগ দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ডামাডোলের আবহে উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর কল্যাণগড় পৌরসভায় ঘটে গেল এক নজিরবিহীন ঘটনা। শুক্রবার গভীর রাতে নিজের বাসভবন থেকে নাটকীয়ভাবে গ্রেফতার হলেন পৌরসভার পৌরপ্রধান তথা তৃণমূল কংগ্রেস নেতা প্রবোধ সরকার। নিজের বাড়ির বাগানে পুরসভার অত্যন্ত গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি পুড়িয়ে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অশোকনগর থানার পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে। তবে এই গ্রেফতারির পর এলাকায় যে ছবি দেখা গেল, তা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বেশ বিরল। দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের গ্রেফতারির পর সাধারণত যেখানে ক্ষোভ বা ‘চোর চোর’ স্লোগান শোনা যায়, সেখানে প্রবোধ সরকারের গ্রেফতারির খবর ছাউর হতেই অশোকনগরজুড়ে রীতিমতো উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা আনন্দে মেতে ওঠেন এবং একে অপরকে লাড্ডু খাইয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।

শুকনো পাতার আড়ালে তথ্য লোপাটের চেষ্টা

ঘটনার সূত্রপাত শুক্রবার রাতে, যখন প্রবোধ সরকারের বাড়ির পিছনের বাগানে আচমকা দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে দেখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গভীর রাতে এই অগ্নিকাণ্ডে সন্দেহ জাগায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন বিজেপির স্থানীয় নেতা ও কর্মীরা। তাঁরা প্রবোধবাবুর বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ ডাকাডাকি করলেও ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকায় প্রথমে কোনো সাড়াশব্দ মেলেনি। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে তৎক্ষণাৎ অশোকনগর থানার পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পর তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। সেই সময় পৌরপ্রধান প্রবোধ সরকার দাবি করেন, বাগানে তিনি কেবল নোংরা পরিষ্কার করে ‘শুকনো পাতা’ পোড়াচ্ছিলেন। তবে বিরোধীরা এই দাবি সম্পূর্ণ নস্যাৎ করে অভিযোগ তোলে, শুকনো পাতা পোড়ানোর নাম করে আসলে পুরসভার নিয়োগ দুর্নীতি সংক্রান্ত নথিপত্র এবং বিভিন্ন সরকারি দলিল-সহ নাগরিকদের পরিচয় পত্র পুড়িয়ে অকাট্য প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করছিলেন এই তৃণমূল নেতা। পরবর্তীতে পুলিশ আধিকারিকরা সেখান থেকে বেশ কিছু আধপোড়া নথির অংশবিশেষ উদ্ধার করেন এবং সরকারি তথ্য বেআইনিভাবে নষ্ট করার অভিযোগে রাতেই প্রবোধ সরকারকে গ্রেফতার করেন।

তদন্তের মোড় ও সম্ভাব্য প্রভাব

রাজ্যজুড়ে চলতে থাকা পুর দুর্নীতি তদন্তের মাঝে অশোকনগরের এই ঘটনা এক নতুন মাত্রা যোগ করল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার গভীর প্রভাব পড়তে চলেছে স্থানীয় প্রশাসন ও শাসকদলের ভাবমূর্তিতে। প্রথমত, আধপোড়া নথির উদ্ধার হওয়া অংশ থেকে পুর নিয়োগ দুর্নীতির আরও বড় কোনো চক্র বা রাঘববোয়ালদের নাম সামনে আসতে পারে, যা তদন্তের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। দ্বিতীয়ত, প্রমাণ লোপাটের এই মরিয়া চেষ্টা প্রমাণ করে যে দুর্নীতির শিকড় কতটা গভীরে পোঁতা।

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে একাধিক হেভিওয়েট নেতা ও কাউন্সিলরদের গ্রেফতারির তালিকায় এবার যুক্ত হলো প্রবোধ সরকারের নাম। তবে অন্য সব ক্ষেত্রে জনতার ক্ষোভ আছড়ে পড়লেও, অশোকনগরের লাড্ডু বিলির এই চটজলদি উৎসব বুঝিয়ে দিচ্ছে যে জনপ্রতিনিধিদের একাংশের ওপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও অনাস্থা ঠিক কতটা চরমে পৌঁছেছে। এই ঘটনা আগামী দিনে বাকি অভিযুক্তদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *