তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদের নতুন ঠিকানা এনসিপিআই আসলে কতটা ধনী? সামনে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য!

মাত্র এক দিন আগেও পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অজানা ছিল একটি নাম— এনসিপিআই বা ‘ন্যাশনলিস্ট সিটিজেন পার্টি অব ইন্ডিয়া’। কিন্তু গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্য রাজনীতির সবথেকে বড় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এই ছোট দলটি। কারণ, তৃণমূল কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধ ও বিদ্রোহী ২০ জন লোকসভা সাংসদ এবার এই অখ্যাত দলের সঙ্গেই হাত মেলাতে চলেছেন। কাকলি ঘোষ দস্তিদার কিংবা শতাব্দী রায়ের মতো প্রথম সারির নেতাদের এই নতুন রাজনৈতিক ঠিকানাটির আসল খুঁটিনাটি ও আর্থিক অবস্থা কেমন, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের তথ্য থেকে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর খবর সামনে এসেছে।
হাওড়ার এক চিলতে দোতলা বাড়িই এখন জাতীয় রাজনীতির ভরসা
হাওড়ার সাঁকরাইলের হাটগাছার বাণীপুর এলাকার একটি সাধারণ সবুজ রঙের দোতলা বাড়ি হঠাৎ করেই এখন রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্র। এটিই হলো এনসিপিআই দলটির মূল সদর দফতর। এতদিন হাওড়ার এই প্রত্যন্ত এলাকায় একপ্রকার অবহেলিত ও ‘দুয়োরানি’র মতোই পড়ে ছিল বাড়িটি।
বাড়িটির দেওয়ালে লেখা রয়েছে ‘জাগো বিশ্ব’। আর দরজার দুই পাশে লেখা রয়েছে দুটি নাম— উত্তীয় কুণ্ডু এবং শিউলি কুণ্ডু। উত্তীয়বাবু স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের প্রকাশক এবং শিউলিদেবী কলকাতা হাইকোর্টের একজন আইনজীবী। এই দম্পতিই মূলত এই দলের প্রধান কাণ্ডারি। জানা গিয়েছে, বছর ৭-৮ আগে পর্যন্ত এই বাড়িটি দুঃস্থ শিশুদের একটি হোম হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখানে বিদেশ থেকে অনুদান আসত। সেই হোমটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই এই দম্পতি এনসিপিআই দলের রাজনৈতিক পথচলা শুরু করেন। বর্তমানে এই বাড়িতে কয়েকজন মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে কাজ করেন এবং সেখানে তেমন কোনও সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরই অস্তিত্ব ছিল না।
তহবিলে মাত্র ১ লক্ষ ১৩ হাজার টাকা! অস্তিত্বহীন এক রাজনৈতিক দল
নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে এই দলটির অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে এক চরম বিস্ময়কর ছবি ফুটে ওঠে। কমিশনের খাতা অনুযায়ী, এই দলটির মোট তহবিলের পরিমাণ মাত্র ১ লক্ষ ১৩ হাজার টাকা! রাজনৈতিক দল হিসেবে এটি অত্যন্ত নগণ্য এবং নজিরবিহীন।
আগেকার নির্বাচনী পারফরম্যান্সের দিক থেকেও এই দলটির কোনও উল্লেখযোগ্য অস্তিত্ব নেই। ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে লড়াই করে এই দলটির প্রার্থীরা মাত্র কয়েকশো ভোট পেয়েছিলেন। এমনকি হাওড়ার স্থানীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনেও এই দল সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনও প্রভাবই ফেলতে পারেনি। অথচ আক্ষরিক অর্থেই এই ‘অস্তিত্বহীন’ এবং ক্ষুদ্র একটি দলেই এবার যোগ দিতে চলেছেন দিল্লির সংসদের ২০ জন শক্তিশালী সাংসদ।
‘আমি একজন বিজেপি সমর্থক’, সভাপতির মন্তব্যে স্পষ্ট নেপথ্যের খেলা
এনসিপিআই দলটির বর্তমান সভাপতি হলেন শান্তনু দে। তিনি উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের বাসিন্দা হলেও একসময় ত্রিপুরায় থাকতেন। দলের ‘কলমের নিব’ প্রতীকটি তাঁরই মস্তিস্কপ্রসূত। ২০২৩ সালের ত্রিপুরা নির্বাচনে লড়াই করে তাঁর দল একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি। তবে তৃণমূলের এই বড়সড় ভাঙন এবং দলবদল নিয়ে শান্তনু দে নিজেই এক বিস্ফোরক সত্য স্বীকার করেছেন।
এনসিপিআই সভাপতি শান্তনু দে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, “আমি একজন বিজেপি সমর্থক। দেশের স্বার্থে যা করার তাই করব।” সভাপতির এই একটি বাক্যেই আসলে গোটা রাজনৈতিক মলাটের পেছনের আসল উদ্দেশ্য ও বড়সড় চালটি সম্পূর্ণ পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।
দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা বর্তমানে ত্রিপুরায় বসবাস করেন, যাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কৈলাশহরের জহিরুল ইসলাম। তিনি ইতিমধ্যেই তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের এই দলে আসার সিদ্ধান্তকে সরাসরি স্বাগত জানিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, ত্রিপুরার এক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর সুগভীর রাজনৈতিক কৌশলের ওপর ভর করেই রাতারাতি একসঙ্গে ২০ জন লোকসভা সাংসদের সমর্থন পেতে চলেছে এই অজানা দলটি। মাটির পথের ধারের একটি শান্ত সবুজ বাড়ি থেকে ভারতীয় রাজনীতির ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠা এই এনসিপিআই আগামী দিনে ঠিক কোন পথে হাঁটে, সেদিকেই এখন নজর গোটা দেশের।