জোড়াফুল কি মমতার হাতেই থাকবে নাকি বিদ্রোহীদের? বুঝে নিন সুপ্রিম কোর্টের সেই ৩টি ঐতিহাসিক রায়

জোড়াফুল কি মমতার হাতেই থাকবে নাকি বিদ্রোহীদের? বুঝে নিন সুপ্রিম কোর্টের সেই ৩টি ঐতিহাসিক রায়

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) বর্তমানে তার সবচেয়ে বড় সাংবিধানিক ও সাংগঠনিক সংকটের মুখোমুখি। দলের ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জনের আকস্মিক দলত্যাগ শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ধাক্কাই নয়, এটি সরাসরি দলের নাম, অস্তিত্ব এবং ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ নির্বাচনী প্রতীক কার দখলে থাকবে—তা নিয়ে এক মহাযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কাকলী ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ত্রিপুরার দল এনসিপিআই-এর সাথে একীভূত হওয়ার ঘোষণা দিয়ে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এই লড়াই যদি শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন ও আদালত পর্যন্ত গড়ায়, তবে আইনি মারপ্যাঁচে কার পাল্লা ভারী থাকবে, তা বুঝতে গেলে দেশের আইন ও সুপ্রিম কোর্টের অতীতের কিছু রায় খতিয়ে দেখা জরুরি।

দলত্যাগ বিরোধী আইন এবং দুই-তৃতীয়াংশের অংক

সাংসদদের এই বিদ্রোহ থেকে পদ বাঁচানোর কৌশলটি বুঝতে গেলে সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইনটি (Anti-Defection Law) জানা প্রয়োজন। ১৯৮৫ সালে পাস হওয়া এই আইনে ২০০৩ সালের ৯১তম সংশোধনের পর ‘দল বিভাজন’ বা স্প্লিট (১/৩ অংশ নিয়ে আলাদা গোষ্ঠী গঠন) সংক্রান্ত নিয়মটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়।

বর্তমান আইন অনুযায়ী, সংসদ বা বিধানসভায় সদস্যপদ টিকিয়ে রেখে দলবদল করতে গেলে সংশ্লিষ্ট আইনসভা দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) সদস্যকে অন্য কোনও দলের সঙ্গে একীভূত বা মার্জ হতে হবে। লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জন অর্থাৎ দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সদস্য একযোগে এনসিপিআই (NCPI) দলে যোগ দেওয়ায় তাঁরা আপাতত আইনি অযোগ্যতা এড়ানোর দাবি করছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সংগঠনকে বাদ দিয়ে স্রেফ একটি ‘শেল কো ম্পা নি’ বা নামসর্বস্ব দলের আশ্রয় নেওয়া এই আইনি কৌশলটি আদালতের স্ক্রুটিনিতে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত কঠিন হবে।

সুপ্রিম কোর্টের যে ৩টি রায় মমতার সবচেয়ে বড় ঢাল

বিদ্রোহী সাংসদেরা সংখ্যার জোরে আত্মপ্রসাদ লাভ করলেও, সুপ্রিম কোর্টের একাধিক ঐতিহাসিক রায় কিন্তু এই লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সবচেয়ে বড় আইনি অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

শীর্ষ আদালতের যে ৩টি রায় বিদ্রোহীদের পথ কঠিন করে তুলবে:

  • সুভাষ দেশাই বনাম মহারাষ্ট্রের রাজ্যপাল (২০২৩ – শিবসেনা মামলা): এই যুগান্তকারী রায়ে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, “মূল রাজনৈতিক দল” (Political Party) এবং “আইনসভা দল” (Legislative Party) দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আইনসভার নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কোনওভাবেই নিজেদের পুরো সংগঠনের মালিক বা প্রভু বলে দাবি করতে পারেন না। সংসদে বা বিধানসভায় হুইপ জারি করা এবং দলের নীতি নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা মূল দল ও তার সভাপতির (এক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) হাতেই ন্যস্ত থাকে।
  • ডঃ মহাচন্দ্র প্রসাদ সিং (২০০৪) ও রাজেন্দ্র সিং রানা (২০০৭) মামলা: এই দুই মামলাতেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল যে, দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে একীভূতকরণ বা মার্জার অবশ্যই সাংগঠনিক স্তরে হতে হবে, স্রেফ কয়েকজন সাংসদ বা বিধায়কের স্তরে নয়। যদি মূল দলের কেন্দ্রীয় সংগঠন অন্য দলের সাথে যুক্ত হতে রাজি না থাকে, তবে শুধুমাত্র আইনপ্রণেতাদের দলবদলকে আইনি পরিভাষায় “দলত্যাগ” হিসেবেই গণ্য করা হবে।
  • রবি নায়েক বনাম ভারত সরকার (১৯৯৪): এই রায়ে আদালত বলেছিল, যদি কোনও জনপ্রতিনিধির আচার-আচরণ বা কার্যকলাপ তাঁর নিজের দলের নীতি এবং মূল নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যায়, তবে আইনিভাবে ধরে নেওয়া হবে যে তিনি ‘স্বেচ্ছায় দলের সদস্যপদ ত্যাগ’ করেছেন।

নির্বাচন কমিশনের তিন পরীক্ষা এবং ‘সাদিক আলী’ মামলা

বিদ্রোহী শিবির জুলাই মাসের আসন্ন সংসদ অধিবেশন শুরু হতেই নির্বাচন কমিশনের (EC) দ্বারস্থ হয়ে প্রতীক ও নামের ওপর অধিকার দাবি করার যে পরিকল্পনা করছে, তার ফয়সালা হয় ১৯৬৮ সালের নির্বাচনী প্রতীক আদেশের ১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী। ১৯৭১ সালের বিখ্যাত ‘সাদিক আলী বনাম নির্বাচন কমিশন’ মামলার ওপর ভিত্তি করে কমিশন মূলত ৩টি প্রধান মাপকাঠিতে এই ধরণের বিবাদের সত্যতা যাচাই করে।

১. আইনসভা সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষা (Test of Legislative Majority)

সংসদ ও বিধানসভায় কোন গোষ্ঠীর সাথে কতজন নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছেন, কমিশন তা খতিয়ে দেখে। লোকসভার ২০ জন সাংসদের পাশাপাশি বিদ্রোহীরা বাংলার ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনের বেশি সদস্যের সমর্থনের দাবি তুলছেন। এই পরীক্ষায় আইনসভার সংখ্যাতত্ত্বে আপাতদৃষ্টিতে বিদ্রোহীদের পাল্লা ভারী মনে হচ্ছে।

২. সাংগঠনিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষা (Test of Organizational Majority)

কমিশন নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখে যে দলের জাতীয় কার্যনির্বাহী কমিটি, মূল পদাধিকারী এবং জেলা সভাপতিদের মতো সাংগঠনিক স্তরে কার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন, কারণ সমগ্র সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের মূল সাংগঠনিক পরিকাঠামো এখনও তাঁদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে।

৩. দলের সংবিধানের পরীক্ষা (Test of Party Constitution)

দলের অভ্যন্তরীণ সংবিধান অনুযায়ী কোনও বিদ্রোহ বা নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন বৈধ কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। যেহেতু তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় গঠনতন্ত্র ও পুরো কাঠামোই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে এবং তাঁকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে তৈরি, তাই বিদ্রোহীদের পক্ষে দলের সংবিধান মেনে নিজেদের ‘আসল’ প্রমাণ করা প্রায় আসাম্ভব।

জোড়াফুল প্রতীক কি ফ্রিজ হতে পারে

এই জটিল আইনি লড়াইয়ের তাৎক্ষণিক পরিণতি কী হতে পারে, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। যদি নির্বাচন কমিশন মনে করে যে উভয় পক্ষের দাবি অত্যন্ত জোরালো এবং বিষয়টি গভীর আইনি পর্যালোচনার দাবি রাখে, তবে তারা একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিতর্কিত মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং তাদের বিখ্যাত ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটি সাময়িকভাবে ফ্রিজ বা স্থগিত করে দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে আসন্ন নির্বাচনগুলির জন্য উভয় পক্ষকেই সম্পূর্ণ নতুন নাম ও পৃথক নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে ময়দানে নামতে হবে।

ইতিমধ্যেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি পাঠিয়ে এই দলত্যাগী গোষ্ঠীকে পৃথক স্বীকৃতি না দেওয়ার এবং মূল দলের সরকারি হুইপ বজায় রাখার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। সাগরিকা ঘোষ ও কীর্তি আজাদের মতো দলীয় নেতৃত্বও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে স্পিকার বা কমিশনের সিদ্ধান্ত বিপক্ষে গেলে তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হবেন। ফলে এই আইনি লড়াই দেশের আদালত কক্ষে দীর্ঘ মাস বা বছর ধরে চলতে পারে, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইনি মারপ্যাঁচ যাই হোক না কেন, তৃণমূল স্তরের লক্ষ লক্ষ কর্মী ও সমর্থক যেহেতু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশেই অটল রয়েছেন, তাই এই লড়াইয়ের চূড়ান্ত ফয়সালা শেষ পর্যন্ত হবে জনগণের আদালতেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *