ভবানীপুরে শুভেন্দুর জয়কে চ্যালেঞ্জ করে সশরীরে হাইকোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!

ভবানীপুরে শুভেন্দুর জয়কে চ্যালেঞ্জ করে সশরীরে হাইকোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!

নির্বাচনী ময়দানের হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এবার শুরু হলো বড়সড় আইনি সংঘাত। বহু আলোচিত ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনী ফলাফলকে সরাসরি আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার দুপুরে আচমকাই তিনি সশরীরে কলকাতা হাইকোর্ট চত্বরে হাজির হন। আদালত সূত্রে খবর, ভবানীপুর বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করার দাবি জানিয়ে দায়ের করা পিটিশনের আইনি নথিপত্রে স্বাক্ষর করতেই তাঁর এই আকস্মিক উপস্থিতি।

এটি সেই ভবানীপুর আসন, যেখানে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই প্রত্যক্ষ করেছিল দেশবাসী। এই কেন্দ্রে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে সরাসরি ও হেভিওয়েট টক্কর হয়েছিল।

শুভেন্দুর কাছে ১৫ হাজার ভোটে পরাজয় ও গণনার মারপ্যাঁচ

ভোটের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গিয়েছে, বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী ১৫,১০৫ ভোটের ব্যবধানে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করেছেন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছিলেন ৭৩,৯১৭টি ভোট এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ৫৮,৮১২টি ভোট। অন্যদিকে, সিপিএম প্রার্থী শ্রীজীব বিশ্বাস ৩,৫৫৬টি ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। এই অভাবনীয় ফলাফল সামগ্রিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেস শিবিরের জন্য মস্ত বড় ধাক্কা ছিল।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ভোট গণনা শুরুর দিক থেকে এবং মাঝের রাউন্ডগুলোতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত মজবুত অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। এমনকি ১৬ এবং ১৭ নম্বর রাউন্ডের গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি পরিষ্কার ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তের রাউন্ডগুলিতে হঠাৎ করেই দুই হেভিওয়েটের মধ্যকার ব্যবধান দ্রুত কমতে থাকে এবং চূড়ান্ত রাউন্ডের গণনায় শুভেন্দু অধিকারী এক ধাক্কায় বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে নিজের জয় নিশ্চিত করেন।

গণনার দিন হট্টগোল ও মমতার গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ

২০২৬ সালের ৪ মে, ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোট গণনার দিন লর্ড সিনহা রোডের সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে অবস্থিত গণনা কেন্দ্রে চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। গণনা চলাকালীন এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি মোবাইল ফোন হাতে স্ট্রং রুমের কাছাকাছি প্রবেশ করলে গণনা প্রক্রিয়া কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণ স্থগিত করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও স্ক্রুটিনির পর পুনরায় গণনা শুরু হয়েছিল।

ভোটের এই ফলকে কোনওভাবেই মেনে নিতে পারেননি তৃণমূল নেত্রী। প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ায় গণনার দিন তিনি নিজেও সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনা কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন যে, তাঁর দলের কাউন্টিং এজেন্টদের জোর করে গণনা কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে, মাঝপথে গণনাকক্ষের সিসিটিভি ক্যামেরা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী বা সেন্ট্রাল ফোর্স উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৃণমূল কর্মীদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেছে। এমনকি গণনা কেন্দ্রে তাঁকে নিজেকেও হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল বলে চাঞ্চল্যকর দাবি করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

নন্দীগ্রামের পর এবার ভবানীপুর, হাইকোর্টে জোড়া মামলা

নিজের নির্বাচনী পরাজয়কে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই পদক্ষেপ অবশ্য প্রথম নয়। এর আগে ২০২১ সালের ঐতিহাসিক বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম আসনে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মাত্র ১,৯৫৬ ভোটে হেরে যাওয়ার পরও তিনি একইভাবে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলে করা সেই নন্দীগ্রাম মামলাটি এখনও কলকাতা হাইকোর্টে বিচারাধীন। সেই মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই এবার ২০২৬ সালের ভবানীপুর কেন্দ্রের পরাজয় নিয়ে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় আইনি ফ্রন্ট খুলে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন হাইকোর্টের আইনি লড়াইয়ে কার জয় হয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *