সব বিদ্রোহীই আসলে দেশদ্রোহী! জোড়াফুল বনাম কলমের নিবের লড়াইয়ে তীব্র আক্রমণ সৌগত রায়ের

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আকাশে অভূতপূর্ব টালবাহানার মাঝেই এবার বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আরও আক্রমণাত্মক রূপ ধারণ করল তৃণমূল কংগ্রেস (TMC)। দলের ২০ জন দলত্যাগী লোকসভা সাংসদকে সরাসরি ‘দেশদ্রোহী’ ও ‘বিশ্বাসের চরম অবমাননাকারী’ আখ্যা দিয়ে তীব্র তোপ দেগেছেন প্রবীণ তৃণমূল নেতা তথা সাংসদ সৌগত রায়। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দাবি তুলে এই বিদ্রোহীরা যখন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে পৃথক দল হিসেবে স্বীকৃতির জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন, ঠিক তখনই সৌগত রায়ের এই চাঁচাছোলা বয়ান রাজনৈতিক লড়াইয়ের পারদ আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
‘একজোড়া ফুল’ বনাম ‘কলমের নিব’, দুই শিবিরে স্পষ্ট মেরুকরণ
বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে নিশানা করে বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায় বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দুটি শিবিরে ভাগ করে দিয়েছেন। তিনি সাফ জানান যে, বাংলায় এখন রাজনৈতিক পরিকাঠামোয় কোনও ধোঁয়াশা নেই।
এই বিষয়ে সৌগত রায়ের মূল বক্তব্যগুলি নিচে দেওয়া হলো:
- আসল তৃণমূল: এই মূল সংগঠনের একমাত্র নেত্রী হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলটির নির্বাচনী প্রতীক বাংলার মানুষের অত্যন্ত আবেগ ও ভালোবাসার ‘একজোড়া ফুল’।
- বিশ্বাসঘাতকদের দল: এই দলত্যাগী গোষ্ঠীটি পরোক্ষভাবে সম্পূর্ণ ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির (BJP) ইশারায় ও নির্দেশে কাজ করছে। আর এই বিদ্রোহী দলের নতুন নির্বাচনী প্রতীক হতে চলেছে ‘কলমের নিব’ (Pen Nib)।
সৌগত রায় মূলত ত্রিপুরা-ভিত্তিক আঞ্চলিক দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা এনসিপিআই-এর (NCPI) প্রতীকের কথাই উল্লেখ করছিলেন, যার ছাতার তলায় বিদ্রোহী সাংসদেরা নিজেদের পদ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছেন।
৪১ শতাংশ জনরায়ের সামনে কী জবাব দেবেন বিদ্রোহীরা?
সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের কঠিন লড়াই এবং ভোটের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিদ্রোহীদের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন সৌগত রায়। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির চরম অপব্যবহার এবং নানাবিধ রাজনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও তৃণমূল কংগ্রেস বাংলায় প্রায় ৪১ শতাংশ সাধারণ মানুষের ভোট নিজের ঝুলিতে পুরতে সক্ষম হয়েছে।
“যেখানে রাজ্যের কোটি কোটি মানুষ স্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর আস্থা বজায় রাখলেন, সেখানে দাঁড়িয়ে এই দলত্যাগীদের গণভিত্তি কী? বাংলার এই বিপুল ও ঐতিহাসিক জনরায়ের মুখে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এই বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক মর্যাদা বা অবস্থান ঠিক কী থাকবে?”
— সৌগত রায়, প্রবীণ তৃণমূল সাংসদ
লোকসভার স্পিকারের কোর্টে বল এবং দশম তফশিলের জটিল অংক
এই রাজনৈতিক নাটকের সমান্তরালে এখন দিল্লির সংসদ ভবনে শুরু হয়েছে তীব্র আইনি দড়িটানাটানি। ভারতীয় সংবিধানের দশম তফশিল অর্থাৎ দলত্যাগ বিরোধী আইন (Anti-Defection Law) অনুযায়ী, সংসদে নিজেদের সদস্যপদ অক্ষুণ্ণ রাখতে গেলে সংশ্লিষ্ট দলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদকে একযোগে অন্য কোনও দলের সঙ্গে একীভূত হতে হয়। আর এই আইনি স্ক্রুটিনি থেকে বাঁচতেই সুদীপ-কাকলীদের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ২৮ জন তৃণমূল সাংসদের মধ্যে ঠিক ২০ জনের সমর্থনের ম্যাজিক ফিগার দাবি করছে।
বিদ্রোহীদের এই পৃথক আসনের ও ‘প্রকৃত তৃণমূল’ হিসেবে স্বীকৃতির দাবির পর এখন পুরো বিষয়ের চাবিকাঠি রয়েছে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার হাতে। সংসদীয় সূত্রের খবর, তাড়াহুড়ো না করে স্পিকার উভয় পক্ষেরই সমস্ত আইনি নথি ও যুক্তি খতিয়ে দেখে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। স্পিকার যদি শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের দুই-তৃতীয়াংশের মার্জারের দাবি আইনিভাবে মেনে নেন, তবে তাঁদের সদস্যপদ রক্ষা পাবে এবং তাঁরা এনসিপিআই-এর ব্যানারে এনডিএ (NDA) সরকারকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দিতে পারবেন। অন্যথায়, দলত্যাগ বিরোধী আইনের কোপে এই ২০ জন হেভিওয়েট সাংসদের পদ রাতারাতি খারিজ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।