রোবট পোষ্যরা এবার আমাদের সঙ্গী! কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ছদ্মবেশে ওত পেতে রয়েছে কোন বড় বিপদ?

রোবট পোষ্যরা এবার আমাদের সঙ্গী! কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ছদ্মবেশে ওত পেতে রয়েছে কোন বড় বিপদ?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) এখন আর শুধু স্মার্টফোন, স্মার্টওয়াচ কিংবা ড্রোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রের গল্পকে বাস্তবে রূপ দিয়ে এই প্রযুক্তি এবার সরাসরি আমাদের ঘরের ভেতরে প্রবেশ করছে রোবট পোষ্য প্রাণীর ছদ্মবেশে। সম্প্রতি আইরোবট (iRobot)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা কলিন অ্যাঙ্গেল তৈরি করেছেন ‘দ্য ফ্যামিলিয়ার’ (The Familiar) নামের একটি অভিনব রোবট, যা সাধারণ গৃহস্থালি যন্ত্রের চেয়ে অনেক আলাদা।

দেখতে একেবারে লোমশ আসল পোষা প্রাণীর মতো এই রোবটটি সময়ের সাথে সাথে পরিবারের সদস্যদের সাথে ভাব বিনিময় করতে এবং মানুষের সাথে একটি যান্ত্রিক বন্ধন তৈরি করতে ডিজাইন করা হয়েছে। আকারে প্রায় একটি কুকুরের সমান এই ডিজিটাল সঙ্গীটি বাড়ির এক ঘর থেকে অন্য ঘরে অনায়াসে মানুষের পিছু নিতে পারে। এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ফ্যামিলিয়ার মেশিনস অ্যান্ড ম্যাজিক’ দাবি করেছে, এই রোবটটির বেশিরভাগ ডেটা বা তথ্য স্থানীয়ভাবেই প্রক্রিয়াকরণ (Local Processing) করা হয় এবং সাধারণ পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়া ক্লাউডে কোনও তথ্য পাঠানো হয় না। তবে এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আড়ালে বিশেষজ্ঞরা এমন কিছু বিপদের ইঙ্গিত দিচ্ছেন যা সাধারণ মানুষকে চমকে দিতে বাধ্য।

সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ওত পেতে থাকা বড় ঝুঁকি

প্রস্তুতকারক কো ম্পা নিগুলি নিরাপত্তার বিষয়ে বড় বড় দাবি করলেও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা কিন্তু এই ধরণের ইন্টারনেট-সংযুক্ত রোবট নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মূল পর্যবেক্ষণগুলি নিচে দেওয়া হলো:

  • দূর থেকে হ্যাকিংয়ের সম্ভাবনা: ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও তথ্য বিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ রায়ান ক্যালোর মতে, একাধিক গবেষণায় ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে যে নেটওয়ার্কযুক্ত গৃহস্থালি রোবটগুলিকে দূর থেকে হ্যাক করা সম্ভব।
  • উন্নত এআই-এর দুর্বলতা: এখন যেহেতু এই যান্ত্রিক পোষ্যগুলোতে অত্যন্ত উন্নত এআই প্রযুক্তি যুক্ত করা হচ্ছে, তাই হ্যাকারদের জন্য এর সম্ভাব্য নিরাপত্তা দুর্বলতা বা লুপহোলগুলো আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
  • ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ একটি রোবট ভ্যাকুয়াম ক্লিনার হ্যাক হলে ক্ষতির পরিমাণ সীমিত থাকে, কিন্তু স্বাধীনভাবে চলাচলে সক্ষম এবং বাড়ির ভেতরের সব তথ্য ও দৃশ্য ধারণ করতে পারা একটি রোবট হ্যাক হলে তা পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে পারে।

আবেগগত আসক্তি এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব

সাইবার ঝুঁকির পাশাপাশি আরেকটি মস্ত বড় মনস্তাত্ত্বিক বিপদের কথা বলছেন গবেষকেরা, যা হলো মানুষের সাথে এই কৃত্রিম রোবটগুলির অতিরিক্ত মানসিক বন্ধন গড়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা। মানুষের একাকীত্ব দূর করার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি হলেও তা উল্টে মানুষের মানসিক ক্ষতি করতে পারে।

গবেষকদের দাবি, মানুষ প্রত্যাশার চেয়েও অনেক দ্রুত এই ধরণের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যন্ত্রের ওপর আবেগগতভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির আইন ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের অধ্যাপক উড্রো হার্টজোগ মনে করেন যে, অতিরিক্ত সামাজিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা রোবটগুলি মানুষের অবচেতন মনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে। কোনও একাকী ব্যক্তি যদি একটি জড় যন্ত্রের ওপর পুরোপুরি আবেগগতভাবে আসক্ত হয়ে পড়ে, তবে আগামী দিনে তার বাস্তব সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা মানুষের স্বাভাবিক আচরণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *