ফাদার-নান ‘গভীরে যাও’ বলা সেই কাউন্সিলরের ওয়ার্ড অফিসে পিল, কন্ডোম, কীভাবে উত্থান অনন্যার?

কলকাতা পুরসভার ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কংগ্রেস কাউন্সিলর অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুকুন্দপুরের ওয়ার্ড অফিসটি ঘিরে এই মুহূর্তে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সম্প্রতি একদল লোক ওই অফিসের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকলে সেখান থেকে উদ্ধার হয় গর্ভনিরোধক পিল, কন্ডোম, ম্যাসাজ করার যন্ত্র এবং প্রমোটারদের নাম সংবলিত টাকার রেট চার্ট। একটি সরকারি ওয়ার্ড অফিসে এই ধরনের আপত্তিকর সামগ্রী উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসতেই অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্থান এবং তাঁর অতীত জীবন নিয়ে নতুন করে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে।

মিস ক্যালকাটা থেকে টলিউড ও বৈবাহিক জীবন

ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে স্নাতক হওয়ার পর কর্মজীবনের শুরুতে এয়ার হোস্টেস হিসেবে কাজ করতেন অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীতে তাঁর মাথায় ওঠে ‘মিস ক্যালকাটা’র মুকুট, যা তাঁকে রাতারাতি লাইমলাইটে নিয়ে আসে।

  • জয়ের সাথে বিয়ে: যে বছর অনন্যা মিস ক্যালকাটা হন, সেই প্রতিযোগিতার বিচারকের আসনে ছিলেন টলিউডের প্রয়াত অভিনেতা জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। বিচারক থাকাকালীনই অনন্যার প্রেমে পড়েন জয়। ২০০০ সালে পরিবারের চাপে পাত্র দেখার মাত্র ৪ দিনের মাথায় জয়ের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন অনন্যা।
  • বিচ্ছেদ ও রাজনীতিতে আগমন: জয় বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র মদ্যপ ছিলেন বলে জানা গেলেও, ঠিক কী কারণে তাঁদের বিয়ে ভেঙেছিল তা অনন্যা কখনও প্রকাশ্যে আনেননি। জয় সক্রিয়ভাবে বিজেপি করলেও অনন্যা ২০১০ সালে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর দল তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। ২০১৯ সালে জয়ের দ্বিতীয় বিয়ে হলেও অনন্যা আর বিয়ে করেননি।

অরূপ বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠতা ও দেবের ছবিতে সুযোগ

২০২১ সালের কলকাতা পুরসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে ১০৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে জিতে কাউন্সিলর হন অনন্যা। রাজনীতিতে আসার পর থেকেই টলিউডে তাঁর প্রভাব উল্কাবেগে বাড়তে থাকে। বিশেষ করে প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং তাঁর ভাই স্বরূপ বিশ্বাসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।

政治 মহলে গুঞ্জন, অরূপ বিশ্বাসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদেই অনন্যা টলিউডের প্রভাবশালী মহলে জায়গা করে নেন। এমনকি সুপারস্টার দেবের ‘প্রধান’ সিনেমাতেও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। অরূপ ও স্বরূপ বিশ্বাসের টলিউড সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ সুবিধা অনন্যা ভোগ করেছেন বলে অভিযোগ বিরোধীদের।

ওয়ার্ড অফিসের কেলেঙ্কারি ও অনন্যার আত্মপক্ষ সমর্থন

১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাঁ-চকচকে লাক্সারি অফিস থেকে কন্ডোম, ম্যাসাজ যন্ত্র এবং প্রমোটারদের থেকে নেওয়া টাকার হিসাবের ডায়রি মেলায় নৈতিকতার প্রশ্নে বিদ্ধ হচ্ছেন এই কাউন্সিলর।

তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, এটি কোনও মেকআপ রুম বা ব্যক্তিগত ঘর নয়। এটি কলকাতা পুরসভার একটি সরকারি কার্যালয়। গত ৮ জুন পুরসভার বোর্ড ভেঙে যাওয়ার পর এই অফিসটি এখন শুধু তাঁর নয়, সরকারি আমলারাও এটি ব্যবহার করেন। তাঁর দাবি, প্রতিটি অফিসেই মূল চেম্বারের পাশে একটি অ্যান্টি-চেম্বার থাকে যেখানে সবাই বসে খাওয়া-দাওয়া এবং আলোচনা করে। সেই জায়গাকে অন্য নোংরা নাম দিলে তাঁর কিছু করার নেই।

ফাদার ও নান নিয়ে সেই যৌনগন্ধী মন্তব্য বিতর্ক

অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিতর্কিত মন্তব্য করার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে কলকাতা পুরসভার বাজেট বিতর্ক চলাকালীন খ্রিষ্টান ধর্মের ‘ফাদার’ এবং ‘নান’দের পবিত্র সম্পর্ক নিয়ে একটি অত্যন্ত কুরুচিকর ও যৌনগন্ধী রূপক গল্প বলেছিলেন তিনি। বাইবেলের ১১২ নম্বর অধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে ‘গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও’ বাণীটিকে তিনি যেভাবে নান ও ফাদারের সম্পর্কের সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন, তা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। সে সময় বিরোধী দল বিজেপির পাশাপাশি তৃণমূলেরই ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুস্মিতা ভট্টাচার্য অনন্যার এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে একে ‘ঘৃণ্য কাজ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *