হকার উচ্ছেদে রেলের বুলডোজারে বড় ধাক্কা হাইকোর্টের! পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ করা যাবে না

রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন রেল স্টেশনে বেআইনি দখলদারি হটাতে রেল কর্তৃপক্ষের চালানো ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযানের ওপর বড়সড় রাশ টানল কলকাতা হাইকোর্ট। আকস্মিক বুলডোজার চালিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়ার বিরুদ্ধে রুটি-রুজি হারানোর আশঙ্কায় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন বালিগঞ্জ, যাদবপুর, বনগাঁ সহ ২৫টি রেল স্টেশনের হকাররা। বুধবার সেই মামলার শুনানিতে হকারদের বড়সড় স্বস্তি দিয়ে আগামী ৩১ জুন পর্যন্ত রেলের উচ্ছেদ অভিযানে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল আদালত।
জোরপূর্বক উচ্ছেদ নয়, সশরীরে পরিদর্শনের নির্দেশ আদালতের
বুধবার কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিরণ্ময় ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ এই মামলায় রেলের একতরফা ‘বুলডোজার নীতি’র সমালোচনা করে একাধিক কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের প্রধান পর্যবেক্ষণগুলি নিচে দেওয়া হলো:
- স্থগিতাদেশ জারি: ৩১ জুন পর্যন্ত যে সমস্ত হকারদের উচ্ছেদের জন্য চূড়ান্ত সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের এই মুহূর্তে কোনওভাবেই জোরপূর্বক বা গায়ের জোরে উচ্ছেদ করা যাবে না।
- সশরীরে পরিদর্শন: উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষকে বিতর্কিত জায়গাগুলি সশরীরে পরিদর্শন (Physical Verification) করতে হবে। মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে সেই সংক্রান্ত বিস্তারিত রিপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে।
- বাধ্যতামূলক আইনি নোটিশ: অতীতে যাদের স্টেশন চত্বরে বসার বা ব্যবসা করার বৈধ অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের সরাতে গেলে রেলকে বাধ্যতামূলকভাবে সুনির্দিষ্ট আইনি নোটিশ দিয়ে আগে থেকে জানাতে হবে।
বিকল্প পুনর্বাসনে সহানুভূতির বার্তা
আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, রেলের জমি উদ্ধার করার অধিকার থাকলেও হকারদের উচ্ছেদ করার আগে তাঁদের জন্য কোনও বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করা যায় কিনা, সেই পুনর্বাসনের বিষয়টি রেল কর্তৃপক্ষকে অত্যন্ত সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। পুনর্বাসন সংক্রান্ত এই পরিকল্পনাও আদালতকে জানাতে হবে রেলকে।
মৌলিক অধিকার ও রেলের জমির লড়াই
আদালতে হকার ও মামলাকারীদের পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী তথা রাজ্যসভার সাংসদ বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য এবং আইনজীবী ফিরদৌস শামিম। বালিগঞ্জ, বামনগাছি, বারুইপুর, ডানকুনি, গুমা, বনগাঁ, দুর্গানগর, মথুরাপুর ও যাদবপুর-সহ ২৫টি স্টেশনের হকারদের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে বিকাশবাবু বলেন, “যেভাবে আচমকা উচ্ছেদ করা হচ্ছে, তাতে মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। কেন্দ্র বা রাজ্য কেউ এই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না। কোনও কারণ না দেখিয়ে এভাবে জীবনের অধিকার, কর্মসংস্থানের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”
পাল্টা শুনানিতে বিচারপতির প্রশ্ন ছিল, রেলের জায়গা বা প্ল্যাটফর্ম যদি দখল করে দোকান বসে, সেক্ষেত্রে রেল কি তাদের তুলতে পারে না? মামলাকারীদের দাবি, রেলের বৈধ লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র যাত্রীদের কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এমনকি স্টেশন থেকে দূরে বসা হকারদেরও তুলে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, রেলের আইনজীবী সওয়ালে দাবি করেন, ১৮৮১ সালে তাঁদের ওই জমি কিনে নেওয়ার ন্যূনতম দাম জমা দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল, যা আজ পর্যন্ত কেউ জমা দেয়নি। তবে সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর, আপাতত ৩১ জুন পর্যন্ত উচ্ছেদে স্থগিতাদেশ দিয়ে হকারদের বড় স্বস্তি দিল কলকাতা হাইকোর্ট।