রেস্তরাঁর ভিড়েও অমলিন বাংলার ঐতিহ্য, জামাইষষ্ঠীর সাবেকিয়ানায় মাতবে বাঙালি

রেস্তরাঁর ভিড়েও অমলিন বাংলার ঐতিহ্য, জামাইষষ্ঠীর সাবেকিয়ানায় মাতবে বাঙালি

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে জামাইষষ্ঠী অন্যতম একটি প্রধান লোকউত্সব। জামাইয়ের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনায় যুগ যুগ ধরে শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ি মায়েরা এই ব্রত পালন করে আসছেন। মূলত জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে এই উৎসব উদযাপিত হয়। বর্তমানের ব্যস্ত সময়ে উৎসব উদযাপনে কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও, জামাইষষ্ঠীর মূল রীতিনীতি ও আন্তরিকতার সাবেকি আবহ আজও বাঙালির ঘরে ঘরে একই রকম অমলিন রয়েছে।

লোককথা ও সামাজিক গুরুত্ব

জামাইষষ্ঠীকে ঘিরে সমাজ ও লোকমুখে নানা প্রচলিত কথা রয়েছে। প্রাচীনকালে একটি সামাজিক সংস্কার ছিল যে, কন্যা সন্তান প্রসবের পর পুত্র সন্তানের জন্ম না দেওয়া পর্যন্ত বাবা-মা মেয়ের বাড়িতে যেতেন না। ফলে মেয়ের মুখ দর্শনের উদ্দেশ্যে জ্যৈষ্ঠ মাসের এই বিশেষ দিনটিকে বেছে নেওয়া হতো। আবার লোকমতে, মেয়ের কোল যাতে সন্তানসম্ভবা হয়, সেই কামনায় মায়েরা মা ষষ্ঠীর পুজো করতেন। কালক্রমে এই সংস্কারের রূপবদল ঘটেছে এবং এটি মেয়ে-জামাইকে সমাদরে আপ্যায়ন ও পারিবারিক মেলবন্ধনের একটি অন্যতম উৎসবে পরিণত হয়েছে।

আচার, অনুষ্ঠান ও প্রয়োজনীয় উপকরণ

জামাইষষ্ঠীর ব্রত পালনের জন্য বেশ কিছু নির্দিষ্ট উপাচারের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে নতুন বস্ত্র, আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, কলার মতো মরসুমি ফল, পান-সুপারি, ধান, ১০৮টি দূর্বা, বাঁশের করুল, করমচা ফল এবং তালের পাখা অন্যতম। উৎসবের দিন সকালে শাশুড়িরা উপবাস থেকে ব্রত পালন করেন। জামাইয়ের কপালে তেল-হলুদের ফোঁটা দিয়ে, হাতে হলুদ সুতো বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর তালের পাখা দিয়ে হাওয়া করে ‘ষাট-ষাট-ষাট’ মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে জামাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়। মাথায় ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করার পর থালায় সাজানো পাঁচ রকমের গোটা ফল ও মিষ্টি দিয়ে জামাইকে মিষ্টিমুখ করানো হয়।

আধুনিকতার প্রভাব ও ২০২৬ সালের দিনক্ষণ

সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বর্তমানের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে জামাইষষ্ঠী উদযাপনে কিছুটা বদল এসেছে। ঘরে রান্নাবান্নার ঝক্কি এড়াতে অনেকেই এখন রেস্তরাঁর বিশেষ জামাইষষ্ঠী থালির ওপর ভরসা রাখছেন। তবে উৎসবের আমেজ ও জামাই আদরের আন্তরিকতায় কোনো কমতি দেখা যাচ্ছে না। পঞ্জিকা মতে, ২০২৬ সালের জামাইষষ্ঠী পড়েছে আগামী ২০ জুন, শনিবার (৫ আষাঢ়)। ১৯ জুন রাত ১০টা ১৬ মিনিট থেকে শুরু হয়ে ২০ জুন রাত ৮টা ৫৭ মিনিট পর্যন্ত ষষ্ঠী তিথি বজায় থাকবে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বাঙালি পরিবারগুলোতে সাড়ম্বরে পালিত হবে জামাই আদরের এই বিশেষ পার্বণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *