সিন্ডিকেট-তোলাবাজি রুখতে কঠোর আইন! পুলিশের হাতে অসীম ক্ষমতা দিয়ে বিধানসভায় আসছে ‘গুন্ডা দমন বিল’

কলকাতা: রাজ্যে সিন্ডিকেট রাজ, তোলাবাজি ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমনে এবার নজিরবিহীন কড়া আইনের পথে হাঁটছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। আসন্ন সোমবার বিধানসভায় পেশ হতে চলেছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এই নতুন আইনের মূল দিকগুলি:
কী এই নতুন আইনের লক্ষ্য?
সরকারের মতে, বর্তমান প্রচলিত আইনে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে অপরাধ প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে এই বিলে।
‘অ্যান্টি-সোশ্যাল’ ও ‘গুন্ডা’র সংজ্ঞা:
- সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করা, জনশৃঙ্খলা নষ্ট করা, সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর বা বেআইনি বালি-পাথর কারবারকে সমাজবিরোধী কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
- গ্যাং বা সিন্ডিকেটের সদস্য হিসেবে অভ্যাসগতভাবে অপরাধে যুক্ত থাকলেই তাকে ‘গুন্ডা’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
প্রশাসনের হাতে বিপুল ক্ষমতা:
- আগাম আটক (Detention): চার্জশিট না থাকলেও শুধুমাত্র রিপোর্টের ভিত্তিতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ কমিশনার কোনো ব্যক্তিকে ১২ মাস পর্যন্ত আটক রাখার নির্দেশ দিতে পারবেন।
- জব্দ ও তল্লাশি: বিনা ওয়ারেন্টে তল্লাশি এবং সন্দেহভাজন নথি বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা থাকবে পুলিশের হাতে।
- জেলায় নিষেধাজ্ঞা: কোনো ব্যক্তি এলাকায় থাকলে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে বলে মনে করলে, প্রশাসন তাঁকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য ওই জেলা বা এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিতে পারবে।
- জামিন অযোগ্য: বিলের ১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এর অধীনে প্রতিটি অপরাধ ‘কগনিজেবল’ (ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার) এবং ‘নন-বেলেবল’ (জামিন অযোগ্য) হবে।
সুরক্ষা কবচ ও নজরদারি:
- আটক ব্যক্তির বিষয় পর্যালোচনার জন্য হাইকোর্টের বিচারপতি বা প্রাক্তন বিচারপতিদের নিয়ে ‘অ্যাডভাইজরি বোর্ড’ গঠন করা হবে।
- সরকারি অফিসাররা যদি ‘সৎ উদ্দেশ্যে’ (Good Faith) কোনো পদক্ষেপ নেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না—এই ধারাটি নিয়ে বিতর্ক হতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
কেন এই বিল নিয়ে শঙ্কা?
আইন বিশ্লেষকদের মতে, এই বিল পাশ হলে প্রশাসনের হাতে অসীম ক্ষমতা চলে আসবে। বিরোধী দলগুলি ইতিমধ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে:
১. সমাজবিরোধী কাজের সংজ্ঞা এতটাই বিস্তৃত যে এর অপব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
২. বিচার শুরুর আগেই এক বছর আটক রাখার বিধান কি সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার বা ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী?
৩. অ্যাডভাইজরি বোর্ডে আইনজীবীর ভূমিকা সীমিত রাখলে আটক ব্যক্তি কি সুবিচার পাবেন?
সব মিলিয়ে, সিন্ডিকেট ও তোলাবাজি রুখতে সরকার এই বিলকে ‘রক্ষাকবচ’ বললেও, বিরোধীদের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে ‘পুলিশি রাজ’-এর নতুন হাতিয়ার। আগামী সোমবার বিধানসভায় এই বিল নিয়ে তুমুল উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে।