মোদী জমানায় ৬৭ মন্ত্রী বিদায়, আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ মাত্র দু’জনের!

মোদী জমানায় ৬৭ মন্ত্রী বিদায়, আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ মাত্র দু’জনের!

নরেন্দ্র মোদীর মন্ত্রিসভায় ধর্মেন্দ্র প্রধান হলেন দ্বিতীয় এমন মন্ত্রী, যিনি সাধারণ মানুষের আন্দোলন এবং বিরোধীদের তীব্র দাবির মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন কারণে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার মোট ৬৭ জন মন্ত্রীকে মাঝপথে মন্ত্রিত্ব থেকে সরে যেতে হয়েছে। এর আগে প্রথমবার নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন তৎকালীন বিদেশ প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর।

‘মি টু’ (Me Too) আন্দোলনের সময় সাংবাদিক আকবরের কয়েকজন প্রাক্তন নারী সহকর্মী তাঁর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার গুরুতর অভিযোগ তোলেন। সেই পরিস্থিতিতে তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রতিমন্ত্রী আকবরকে ডেকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেন। বলাই বাহুল্য, এই সিদ্ধান্ত ছিল প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের।

তবে মোদী জমানায় যে ৬৭ জন মন্ত্রীকে মাঝপথে সরে যেতে হয়েছে, তাঁদের সিংহভাগকেই মন্ত্রিত্ব হারাতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কিংবা দলের অনাস্থার কারণে। অর্থাৎ, মন্ত্রী হিসেবে তাঁরা নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারmছিলেন না। লোকসভার চলমান বাদল অধিবেশনের আগেই মন্ত্রিসভায় আরও একবার রদবদল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি ঘিরে দেশজুড়ে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সেই রদবদল আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত ওই রদবদলে নাম ছিল শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানেরও। তবে সেই পরিবর্তনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল তাঁকে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী করে পুরস্কৃত করার উদ্দেশ্যে। রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মোহন মাঝিকে নিয়ে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব সন্তুষ্ট নয়।

কিন্তু ‘নিট’ কেলেঙ্কারি নিয়ে তীব্র আন্দোলনের চাপে পড়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হওয়ায়, ধর্মেন্দ্র প্রধানের সেই বড় পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা এখন একপ্রকার হাতছাড়া হতে চলেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিকমহল। এর ফলে আপাতত ওড়িশার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার সুরক্ষিত রইল বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর মন্ত্রিসভায় একটি বড় ধরনের রদবদল করেছিলেন। সেই সময় ১২ জন মন্ত্রীকে বাদ দিয়ে নতুন মুখ আনা হয়। বাদ পড়া মন্ত্রীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিয়াল নিশাঙ্ক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষবর্ধন এবং আইন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী রবি শংকর প্রসাদ।

অন্যদিকে, ২০১৯ সালে মোদীর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন এনডিএ জোটের দুই শরিক দলের মন্ত্রী— তৎকালীন অকালি দলের হরশিমরাত কৌর বাদল এবং শিবসেনার অরবিন্দ সাওয়ান্ত। তাঁদের পদত্যাগের কারণ ছিল বিতর্কিত কৃষি বিলের বিরোধিতা। ওই বিলের প্রতিবাদেই এই দুই শরিক দল শেষ পর্যন্ত এনডিএ জোট ত্যাগ করেছিল।

এছাড়াও, বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একাধিক মন্ত্রীকে রাজ্যপাল অথবা রাজ্যের মন্ত্রী হিসেবে পাঠানো হয়েছে। আবার মুক্তার আব্বাস নকভি, আরসিপি সিং এবং জর্জ কুরিয়েনের মতো মন্ত্রীদের মন্ত্রিসভা থেকে সরে যেতে হয়েছে রাজ্যসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে। পরবর্তীতে তাঁদের আর নতুন করে রাজ্যসভার সদস্য করা হয়নি।

ভারতে অতীতে রেলমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি সবচেয়ে জোরালোভাবে উঠেছে। অতীতে বড় মাপের রেল দুর্ঘটনায় নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করে রেলমন্ত্রীদের পদত্যাগ করার নজিরও রয়েছে দেশে। কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর জমানায় বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনার পরেও কোনো রেলমন্ত্রী নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করেননি। একইভাবে মোদীর জমানায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সহ একাধিক মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি বিভিন্ন সময়ে জোরালো হয়েছে। পহেলগাম হত্যাকাণ্ডের ব্যর্থতার নৈতিক দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ইস্তফা দাবি করা হয়েছিল। সংসদে বিরোধীরা এই নিয়ে সরকারকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করলে, প্রধানমন্ত্রী নিজে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাল হয়ে দাঁড়ান। অমিত শাহের কার্যকালে কীভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক দেশের জঙ্গি নাশকতা সফলভাবে মোকাবিলা করেছে, তার বিস্তারিত তথ্য প্রধানমন্ত্রী সংসদে তুলে ধরেছিলেন।

যদিও নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করার এক অনন্য আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন বিজেপির প্রাতঃস্মরণীয় নেতা লালকৃষ্ণ আডবাণী। গত শতকের নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে হাওলা কাণ্ডে নাম জড়ানোর পর আডবাণী তাঁর সাংসদ পদ ত্যাগ করেছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, যতদিন না তিনি আইনগতভাবে নিরপরাধ প্রমাণিত হচ্ছেন, ততদিন তিনি আর সংসদে ফিরবেন না। পরবর্তীকালে তাঁর বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *