হরিণঘাটা শিল্পপার্কে জমি বরাদ্দে ১২.৮৬ কোটির আর্থিক ক্ষতি! ক্যাগ রিপোর্টে চাঞ্চল্য

হরিণঘাটা শিল্পপার্কে জমি বরাদ্দে ১২.৮৬ কোটির আর্থিক ক্ষতি! ক্যাগ রিপোর্টে চাঞ্চল্য

নদিয়ার হরিণঘাটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে জমি বরাদ্দ নিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আর্থিক ক্ষতির গুরুতর অভিযোগ তুলল কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ)। ই-কমার্স সংস্থা ফ্লিপকার্টের লজিস্টিক শাখা ‘ইনস্টাকার্ট সার্ভিসেস’-কে জমি দেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ শিল্পোন্নয়ন নিগমের ১২ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে ক্যাগের রিপোর্টে।

২০২৩ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ২০২৪ সালের পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিংস সংক্রান্ত এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় এই হিসেব পরীক্ষক সংস্থাটি। ক্যাগের তথ্য অনুযায়ী, হরিণঘাটা শিল্পতালুকের জমির বেস প্রাইস বা ভিত্তি মূল্য নির্ধারণের সময় প্রকল্প এলাকার বিশাল আকারের জলাশয়গুলিকে বরাদ্দযোগ্য জমির হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। অথচ শিল্পোন্নয়ন নিগমের নিজস্ব নির্দেশিকা অনুযায়ী, শুধুমাত্র শিল্পে ব্যবহারযোগ্য বা বরাদ্দ করার মতো জমির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করেই প্রতি একরের দাম নির্ধারণ করার নিয়ম রয়েছে। এই নির্দিষ্ট নীতি লঙ্ঘন করার কারণেই নিগমের এত বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

জমি অধিগ্রহণ ও বরাদ্দের পেছনের চিত্র

২০১৭ সালের অগস্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য মন্ত্রিসভা শিল্প গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ১,৩২৬.৯৩ একর জমি শিল্পোন্নয়ন নিগমের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর হরিণঘাটা শিল্পপার্কের জন্য ৩৫৮.১৯ একর জমি অধিগ্রহণের কাজে ২০১ কোটি টাকারও বেশি অনুমোদন করে রাজ্য। ২০১৮ সালের অক্টোবরে নিগম ওই জমির দখল নেয়।

ওই বছরই অগস্টে শিল্প গড়ার আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন চাওয়া হয়, যেখানে ৯৯ বছরের লিজের জন্য প্রতি একর জমির দাম ৬৩ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকা ধার্য করা হয়। এরপর ফ্লিপকার্টের সহযোগী সংস্থা ইনস্টাকার্ট সার্ভিসেস ১০৭.৩৫ একর জমির আবেদন করে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে রাজ্য মন্ত্রিসভা সেই প্রস্তাবে অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে আরও জমি যুক্ত হওয়ায় মোট ১০৯.১২ একর জমির জন্য ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দীর্ঘমেয়াদী লিজ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বর্তমানে এই চত্বরেই ফ্লিপকার্টের দেশের বৃহত্তম ফুলফিলমেন্ট সেন্টারটি গড়ে উঠেছে।

ক্যাগের আপত্তির মূল কারণ

২০২২ সালের ডিসেম্বরে ক্যাগ নথিপত্র পরীক্ষা করে দেখে যে, হরিণঘাটার ওই মোট ৩৫৮.১৯ একর জমির মধ্যে প্রায় ৫৫.৮৯ একর জমিই আসলে জলাশয়, যা শিল্পের জন্য ব্যবহারযোগ্য নয়। ফলে প্রকৃত বরাদ্দযোগ্য জমির পরিমাণ ছিল ৩০২.৩০ একর। কিন্তু জমির বেস প্রাইস নির্ধারণের সময় পুরো ৩৫৮.১৯ একরকেই হিসেবে ধরা হয়েছিল।

ক্যাগের হিসাব বলছে, নিগমের নিজের নিয়ম মেনে জমির অধিগ্রহণ খরচের সঙ্গে ১০ শতাংশ প্রশাসনিক খরচ যোগ করে তা কেবল বরাদ্দযোগ্য জমির ওপর ভাগ করলেই সঠিক বেস প্রাইস নির্ধারণ সম্ভব ছিল। সেই হিসেবে প্রতি একর জমির দাম হওয়া উচিত ছিল ৭৫ লক্ষ ২৩ হাজার টাকা, অথচ তা নির্ধারণ করা হয়েছিল মাত্র ৬৩ লক্ষ ৪৯ হাজার টাকায়। এর ফলে ১০৯.১২ একর জমির জন্য ইনস্টাকার্টের কাছ থেকে ৮২ কোটি ৯ লক্ষ টাকা লিজ প্রিমিয়াম পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে আদায় হয়েছে মাত্র ৬৯ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা।

রাজ্যের সাফাই ও ক্যাগের অবস্থান

২০২৩ সালের মে মাসে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ক্যাগকে জানানো হয় যে, শিল্পোন্নয়ন নিগমের পরিচালন পর্ষদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার পরেই ওই দাম চূড়ান্ত করা হয়েছিল এবং মন্ত্রিসভা তাতে সম্মতি দিয়েছিল। তবে রাজ্যের এই ব্যাখ্যা মেনে নেয়নি কেন্দ্রীয় হিসেব পরীক্ষক সংস্থাটি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *