পাক-অধ্যুষিত কাশ্মীরে ভোটের নামে তাণ্ডব: ৩ মাসে নিহত ৫১, রাষ্ট্রসংঘে সরব মানবাধিকার সংস্থা

পাক-অধ্যুষিত কাশ্মীরে ভোটের নামে তাণ্ডব: ৩ মাসে নিহত ৫১, রাষ্ট্রসংঘে সরব মানবাধিকার সংস্থা

পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে (PoK) তিন ধাপের আঞ্চলিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সহিংসতার চিত্র সামনে এসেছে। নিরাপত্তাবাহিনীর দমনপীড়ন ও স্থানীয় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে গত তিন মাসে অন্তত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি অনুধ্যান করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জাতিসংঘের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ দাবি করেছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার ও অসরকারি সংস্থা সূত্রে খবর, সোমবার নির্বাচনের শেষ ধাপের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হলেও গোটা অঞ্চলজুড়ে পরিস্থিতি থমথমে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বহু আহতের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। নিহতদের মধ্যে মোহাম্মদ আখতার নামে এক ব্রিটিশ নাগরিকও রয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক অতীতে কোনো নির্বাচনের জের ধরে এ ধরনের ভয়াবহ প্রাণহানির নজির বিশ্বে বিরল।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ECOSOC) বিশেষ পরামর্শক সংস্থা ‘এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস’ (ACHR) মঙ্গলবার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানায়— গত ৫ জুন থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে এই হিংসাত্মক ঘটনায় ৪৫ জন সাধারণ নাগরিক এবং ৬ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া অন্তত ১৩৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৭ জুন রাওয়ালকোটে ১১ জন, ১৪ জুলাই তারাড়খেল ও রাওয়ালাকোটে ৯ জন এবং ২৭ ও ২৮ জুলাই রাওয়ালাকোট ও মিরপুর অঞ্চলে প্রায় ৩০ জনের মৃত্যু হয়।

অসন্তোষের মূল কারণ ও দমনপীড়ন: গত ৫ জুন ‘জয়েন্ট অ্যাওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (JAAC)-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পাক প্রশাসন, যার পর থেকেই শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

JAAC মূলত একটি নাগরিক অধিকার সংগঠন। তাদের মূল দাবিগুলোর মধ্যে ছিল— ভর্তুকিতে শিক্ষা ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, বিমানবন্দর ও আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ইন্টারনেট পরিষেবা পুনঃস্থাপন এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের আইনসভায় পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন বাতিল করা।

এই নির্বাচন বয়কট করেছিল JAAC এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল ‘পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ’ (PTI)। ফলে ক্ষমতাসীন দল ‘পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ’ (PML-N) প্রথম দুই ধাপে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে জয়লাভ করে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ দাবি: পাকিস্তানের দুই প্রান্তে তৈরি হওয়া অস্থিরতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে কাশ্মীরে বিক্ষোভ, অন্যদিকে ১১ আগস্ট বালুচিস্তানের স্বাধিকারকামীদের ‘স্বাধীনতা দিবস’ পালনকে কেন্দ্র করে বালুচিস্তানেও সেনা অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে মুখ খুলেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। তিনি এই হিংসার একটি ‘দ্রুত, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের’ আহ্বান জানান। একই সাথে কোনো নাগরিক সমাজ সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

মঙ্গলবার এশিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস (ACHR) জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধানের কাছে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে পাক-অধ্যুষিত কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানের আবেদন জানিয়েছে।

উল্লেখ্য, পাকিস্তান সরকার ওই অঞ্চলে বাইরের লোক ও পর্যটকদের প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় পুরো এলাকাটি এখন বিশ্বমাধ্যম ও পর্যবেক্ষকদের অগোচরে চলে গেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *