ফরাক্কা কি ‘মৃত্যুফাঁদ’? গঙ্গা জলচুক্তি নবায়নে ভারতের কাছে ‘গ্যারান্টি’ চায় ঢাকা!

ফরাক্কা কি ‘মৃত্যুফাঁদ’? গঙ্গা জলচুক্তি নবায়নে ভারতের কাছে ‘গ্যারান্টি’ চায় ঢাকা!

নয়াদিল্লি ও ঢাকা: ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ফের উঠে এসেছে গঙ্গার জলবণ্টন ইস্যু। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা জলচুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসেই শেষ হতে চলেছে। তবে এই চুক্তি পুনর্নবীকরণের আগেই দিল্লির কাছে সুনির্দিষ্ট ‘গ্যারান্টি’ দাবি করছে ঢাকা, যা দুই দেশের সম্পর্কে নতুন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

১৯৯৬ সালের চুক্তির প্রেক্ষাপট:

১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। মূলত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক বা স্বল্প জলস্তরের মরশুমে ফরাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার জল ভাগাভাগি নিশ্চিত করাই ছিল এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের অবস্থান ও ‘গ্যারান্টি’ দাবি:

সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত ‘গঙ্গা জলচুক্তি: পুনঃআলোচনার বিষয়সমূহ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বাংলাদেশের জলসম্পদ মন্ত্রী শহিদুদ্দিন চৌধুরী আনি জানান, নতুন চুক্তিতে শুষ্ক মরশুমেও নিয়মিত জল পাওয়ার সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাঁর দাবি, বর্তমান চুক্তিটি যে সময়ের জলবিজ্ঞান সংক্রান্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, আজকের জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং খরার প্রেক্ষাপটে তা অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে যে গ্যারান্টি ক্লজ ছিল, ১৯৯৬ সালে তা বাদ দেওয়া হয়—বাংলাদেশ এখন তা ফের ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছে।

বাংলাদেশি মন্ত্রী আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, কূটনৈতিক আলোচনায় সুরাহা না হলে এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনে তারা আন্তর্জাতিক সংস্থার দ্বারস্থ হতেও দ্বিধা করবে না। আগামী মাসে রাষ্ট্রসংঘেও বিষয়টি তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

ফরাক্কা ব্যারেজ ঘিরে বিতর্ক ও ভারতের যুক্তি:

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ফরাক্কা ব্যারেজকে একটি সংবেদনশীল ও আবেগের জায়গা থেকে দেখা হয়। বাংলাদেশের জলসম্পদ মন্ত্রীর মতে, ফরাক্কা ব্যারেজকে তাঁর দেশের মানুষ ‘মৃত্যুফাঁদ’ বলে মনে করেন এবং এর পর ভারতের তৈরি একাধিক ব্যারেজ দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে।

অন্যদিকে ভারতের অবস্থান পরিষ্কার—ফরাক্কা কোনো মূল বাঁধ নয়, বরং এটি একটি জলপ্রবাহ পরিবর্তনকারী কাঠামো (Barrage)। পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর নাব্যতা বজায় রাখতে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক জল ফরাক্কা খালে প্রবাহিত করা হয় এবং বাকি অংশ বাংলাদেশে চলে যায়। ভারত নিয়মিত জলসম্পদের তথ্য বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগ করে নেয় এবং যৌথ নদী কমিশনই এর প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম।

উল্লেখ্য, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি যৌথ নদী প্রবাহিত। বর্তমান স্পর্শকাতর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গঙ্গা ও তিস্তার মতো নদীগুলির জলবণ্টন চুক্তি নবায়ন করা দুই দেশের কূটনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *