“ভয় আউট, ভরসা ইন!” মাঝরাতে বর্ধমানে ঝটিকা সফর শেষে কী বার্তা দিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী?

নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান: রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার আসল রূপ ও পরিকাঠামো সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কলকাতা থেকে সোজা পূর্ব বর্ধমানে পৌঁছে দুটি হাসপাতালে আচমকা হাজির হন তিনি। মন্ত্রীর এই ঝটিকা অভিযানে হাসপাতাল চত্বরে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।
প্রথম স্টপ: বড়শুল প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রাত ৯টা নাগাদ বর্ধমান ২ নম্বর ব্লকের বড়শুল ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সেখানে প্রতিটি বিভাগ ঘুরে দেখার পাশাপাশি কর্তব্যরত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন। এরপর মেডিসিন বিভাগে গিয়ে ভর্তি থাকা রোগীদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
রোগীরা চিকিৎসা পরিষেবা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও, হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে মারাত্মক ক্ষুব্ধ হন মন্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গে সাফাইকর্মীকে ডেকে হাসপাতাল নিয়মিত ও নিখুঁতভাবে পরিষ্কার রাখার কড়া নির্দেশ দেন।
দ্বিতীয় স্টপ: বর্ধমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল বড়শুল সফর শেষ করে রাত ১০টা নাগাদ মন্ত্রী সোজা চলে যান বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন এবং জুনিয়র ডাক্তার, নার্সিং স্টাফ ও রোগীদের পরিজনদের অভাব-অভিযোগ শোনেন।
পরিদর্শন শেষে মন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য:
- পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, “চিকিৎসা নিয়ে রোগীরা সন্তুষ্ট হলেও পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা একদমই সন্তোষজনক নয়।” বিশেষ করে জরুরি বিভাগের নিরাপত্তা ও মহিলা চিকিৎসকদের রেস্ট রুমের সুরক্ষা নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, পুলিশের পক্ষে ২৪ ঘণ্টা ভেতরে পাহারা দেওয়া সম্ভব নয়, তাই হাসপাতালের নিজস্ব ‘ইন-হাউস সিকিউরিটি’ আরও জোরদার করতে হবে।
- কর্মপরিবেশ ও কর্মীসংকট: জরুরি বিভাগে নার্সিং স্টাফের ঘাটতি মেটানো এবং ডাক্তার-নার্সদের উপযুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “চিকিৎসক ও নার্সরা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে না পারলে রোগীরা ভালো পরিষেবা পাবেন না। তাই তাঁদের অভাবের পাশাপাশি আবদারও শুনতে হবে।”
- নম্বর টেম্পারিং বিতর্ক: বর্ধমান মেডিকেলে নম্বর টেম্পারিং প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে একজনকে সরানো হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে।
- ‘থ্রেট কালচার’ ও অনাময় হাসপাতাল বিতর্ক: ‘থ্রেট কালচার’ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে মন্ত্রী দাবি করেন, “আগে ভয় কাজ করলেও এখন পরিস্থিতির বদল ঘটেছে—এখন ভয় আউট, ভরসা ইন।” অভীক দে-কে ঘিরে অনাময় হাসপাতালের বিতর্ক ও অনিয়ম নিয়ে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা পড়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
- ব্লক সভাপতির ভাইয়ের গ্রেফতারি বিতর্ক: এক তৃণমূল নেতার ভাইয়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, “কোনো একক ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো ঠিক নয়। দেশের প্রতি অনুগত মুসলিম সম্প্রদায়ই দেশবিরোধী মানসিকতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আগে সরব হবেন।”
ভবিষ্যতের বার্তা: সরকারি হাসপাতালের মান উন্নত করতে এবং রোগীদের স্বার্থ রক্ষায় এই ধরনের আচমকা নৈশ অভিযান ভবিষ্যতেও জারি থাকবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে একই সঙ্গে হাসপাতালের ভেতরের অংশে সংবাদমাধ্যমের অবাধ যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি, যাতে রোগীদের চিকিৎসায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।