তিব্বতে কম্পন, নেপালে মহাপ্রলয়: কয়েক মিনিটে ধ্বংসলীলা চালাল ভোটেকোশির হড়পা বান!

তিব্বতে কম্পন, নেপালে মহাপ্রলয়: কয়েক মিনিটে ধ্বংসলীলা চালাল ভোটেকোশির হড়পা বান!

বুধবার সকালে হিমালয়ের কোলে প্রকৃতির এক মর্মান্তিক ও রুদ্র রূপ দেখল নেপাল। স্থানীয় সময় সকাল আনুমানিক ৯টা নাগাদ আচমকাই তিব্বত সীমান্তঘেঁষা রাসুয়া জেলায় নেমে আসে প্রবল হড়পা বান। চোখের পলকে ভেসে যায় একের পর এক ঘরবাড়ি, গাড়ি, সেতু, রাস্তাঘাট এমনকি একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। হিমালয়-পরিবেষ্টিত এই দেশটিতে কেন হড়পা বানের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে, এই ঘটনা যেন ফের তা স্পষ্ট করে দিল।

সাধারণ বন্যা ও হড়পা বানের পার্থক্য: সাধারণ বন্যায় নদীর জল ধীরে ধীরে বাড়লেও, হড়পা বান নামতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। সতর্ক হওয়ার ন্যূনতম সুযোগটুকুও পাওয়া যায় না। কেবল মুষলধারে বৃষ্টিই নয়— পাহাড়ের ঢালে ধস নেমে তৈরি হওয়া সাময়িক হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে বা হিমবাহ-হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে (‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ বা ‘GLOF’) এই মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়। যেমনটা ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদে ঘটেছিল, যাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত ৫৫ জন।

কেন বারবার নেপালেই এই বিপর্যয়? ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে নেপাল একটি ‘তরুণ’ ও অস্থিতিশীল পাহাড়ি অঞ্চল। খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে জল অত্যন্ত দ্রুত নিচে নেমে আসে। জল সমতলে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ না পাওয়ায় সরু উপত্যকায় নদীর গতি তীব্র রূপ নেয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়ন। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে হিমবাহ গলে বড় বড় হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হচ্ছে। তুষারধস, ভূমিধস বা ভূমিকম্পের কারণে এসব দুর্বল বাঁধ ভেঙে মুহূর্তে নেমে আসে প্রলয়। গবেষণা সংস্থা ‘ICIMOD’-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক শতাব্দীতে নেপালে ৯০টিরও বেশি এ ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে।

তিব্বতের ভূমিকম্প ও ‘চেন রিঅ্যাকশন’: নেপালের আবহাওয়া দপ্তরের মতে, কেবল স্থানীয় বৃষ্টিপাত এই ধ্বংসলীলার কারণ নয়। ঘটনার ঠিক কিছুক্ষণ আগে (সকাল ৮:২২ মিনিটে) তিব্বতে ৪.৯ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সেই কম্পনের ফলেই বিশাল তুষারধস নেমে আসে এবং সকাল ৮:৩৭ নাগাদ সৃষ্টি হয় এই হড়পা বান।

ভারতে ছড়িয়ে পড়া আশঙ্কাজনক প্রভাব: তিব্বত থেকে উৎপন্ন ‘ভোটেকোশি নদী’ নেপালের ত্রিশূলী নদীর সাথে মিশে ভারতের গণ্ডক নদীতে এসে পড়ে। ফলে হিমালয়ের এই সীমান্তপারের বিপর্যয় দ্রুত ভারতেও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ইতোমধ্যে গণ্ডক নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় বিহার ও উত্তরপ্রদেশে জারি করা হয়েছে উচ্চ সতর্কতা (High Alert)।

প্রকৃতি ও মানুষের যৌথ দায়: জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণ, বন উজাড় এবং নদীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির ফলেই হিমালয় অঞ্চলে বন্যায় অনিশ্চয়তা ও তীব্রতা বহু গুণ বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীস্ফীতি, ধস ও অতিবৃষ্টি এখন ‘চেন রিঅ্যাকশন’-এর মতো কাজ করছে, যা গোটা হিমালয় অববাহিকার জন্য অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *