কৌশিকী নাকি কৌশি? ভাদ্র অমাবস্যার আসল সত্যিটা জেনে চমকে যাবেন!

কৌশিকী নাকি কৌশি? ভাদ্র অমাবস্যার আসল সত্যিটা জেনে চমকে যাবেন!

ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথি বলতেই ভক্তদের মনে ভেসে ওঠে তারাপীঠ মন্দিরের উপচে পড়া ভিড় এবং দেবী কৌশিকীর আরাধনার ছবি। প্রচলিত বিশ্বাস, এই তিথিতেই দেবী পার্বতীর দেহকোষ থেকে আবির্ভূত হয়ে শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করেছিলেন দেবী কৌশিকী। কিন্তু জ্যোতিষবিদ ও শাস্ত্রজ্ঞদের একাংশের মতে, এই প্রচলিত ধারণার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অন্য শাস্ত্রীয় সত্য।

‘কৌশিকী’ নয়, মূল নাম ‘কৌশি অমাবস্যা’!

স্মৃতিশাস্ত্র ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই তিথির আসল নাম ‘কুশোৎপাটিনী’ বা ‘কুশগ্রহণী অমাবস্যা’। লোকমুখে অপভ্রংশ হয়ে যা ‘কৌশি অমাবস্যা’ রূপ নিয়েছে।

  • কেন কুশ তোলার নিয়ম? আষাঢ়ের দেবশয়নী একাদশী থেকে কার্তিকের উত্থান একাদশী পর্যন্ত চার মাস ভগবান বিষ্ণু যোগনিদ্রায় থাকেন। এই ‘চতুর্মাস’ সময়ে যেকোনো শুভ কাজ এবং বিষ্ণুর অঙ্গস্বরূপ ‘কুশ’ তোলা নিষিদ্ধ।
  • একদিনের ছাড়: শাস্ত্রমতে, একমাত্র ভাদ্র মাসের এই অমাবস্যা তিথিতে কুশ তুললে বিষ্ণু রুষ্ট হন না। এই দিনে সংগৃহীত কুশ শুকিয়ে গেলেও সারা বছর পবিত্র থাকে এবং পুজো-পাঠে ব্যবহার করা যায়।

দেবী কৌশিকীর আবির্ভাব কবে?

জ্যোতিষবিদ দেবজ্যোতি মজুমদারের মতে, মার্কণ্ডেয় পুরাণ ও শ্রীশ্রী চণ্ডী অনুসারে দেবী কৌশিকীর প্রকৃত আবির্ভাব ঘটেছিল দুর্গা পুজোর সময়ে, চণ্ড-মুণ্ড বধের উদ্দেশ্যে। অন্য এক মতে, দীপান্বিতা অমাবস্যায় তাঁর আবির্ভাব।

তবে মতান্তরে অন্য একটি গল্পও প্রচলিত— কৈলাসে দেবী পার্বতীকে শিব ‘কালিকা’ বলে সম্বোধন করায় মানস সরোবরের তীরে কঠোর তপস্যা শুরু করেন দেবী। তপস্যা শেষে সরোবরের জলে স্নান করে তিনি কৃষ্ণবর্ণ কোশিকা পরিত্যাগ করে গৌরী রূপ ধারণ করেন। সেই বর্জিত কালো কোশিকা থেকেই দেবী কৌশিকীর জন্ম হয়, যিনি পরে শুম্ভ-নিশুম্ভকে বিনাশ করেন।

তারাপীঠে কেন এত আয়োজন?

শাস্ত্রজ্ঞদের মতে, এই কৌশি অমাবস্যার দিনেই তারাপীঠের শ্বেত শিমুল বৃক্ষতলে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন পরম সাধক বামাক্ষ্যাপা এবং মা তারা তাঁকে দর্শন দিয়েছিলেন। এছাড়া তন্ত্রসাধকদের বিশ্বাস, এই অমাবস্যার রাতে বিশেষ মুহূর্তে স্বর্গ ও নরকের দ্বার কিছু সময়ের জন্য উন্মুক্ত হয়, যা সাধনায় সিদ্ধিলাভের জন্য অত্যন্ত অলৌকিক ও শক্তিশালী সময়।

শক্তিপূজা ও পিতৃতর্পণের শুভ যোগ

ভাদ্র অমাবস্যা পিঠোরী অমাবস্যা নামেও পরিচিত। এই দিনে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করলে পিতৃদোষ কাটে বলে মনে করা হয়। পাশাপাসি, মঙ্গলবার ও পুষ্যা নক্ষত্রের বিশেষ যোগ থাকলে অপরাজিতা (বিষ্ণুক্রান্তা) ফুল দিয়ে মা তারার পুজো করা অত্যন্ত ফলদায়ক।

সব মিলিয়ে, শাস্ত্রীয় ও পৌরাণিক নানা মতের মেলবন্ধনে ভাদ্রের এই অমাবস্যা তিথি সনাতন ধর্মে অত্যন্ত মহিমান্বিত ও মাহাত্ম্যপূর্ণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *