বিনা অপারেশনে, কেমোথেরাপি ছাড়াই গায়েব ক্যান্সারের টিউমার! চিকিৎসা বিজ্ঞানে যুগান্তকারী আবিষ্কার

বিনা অপারেশনে, কেমোথেরাপি ছাড়াই গায়েব ক্যান্সারের টিউমার! চিকিৎসা বিজ্ঞানে যুগান্তকারী আবিষ্কার

মানুষের শরীরের ভেতরের ছবি দেখতে আলট্রাসাউন্ডের ব্যবহার আমরা সবাই জানি। কিন্তু এবার এই উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গকেই কাজে লাগিয়ে, কোনো রকম কাটাছেঁড়া ছাড়াই ক্যান্সারের টিউমার ধ্বংসের এক যুগান্তকারী পদ্ধতি আবিষ্কার করলেন গবেষকরা!

যেভাবে এল এই অভাবনীয় সাফল্য: এর পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগানের বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশলী জেন জু-এর (Zhen Xu) কয়েক দশক আগের একটি ঘটনাচক্রে পাওয়া আবিষ্কার। ২০০-র দশকে পিএইচডি করার সময় তিনি শূকরের হৃদপিণ্ডের টিস্যুতে পরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগাক্রান্ত টিস্যু ধ্বংস করার উপায় খোঁজা। পরীক্ষা চলাকালীন উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ প্রয়োগ করতেই তিনি অবাক হয়ে দেখেন, মাত্র এক মিনিটের মধ্যে টিস্যুতে গর্ত তৈরি হয়ে যাচ্ছে! তাঁর এই অপ্রত্যাশিত আবিষ্কারই জন্ম দেয় ‘হিস্টোট্রিপসি’ (Histotripsy) নামক এক নতুন পদ্ধতির।

কীভাবে কাজ করে এই ‘হিস্টোট্রিপসি’?

  • এই পদ্ধতিতে ক্যান্সারের টিউমারের একটি নির্দিষ্ট অংশে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ কেন্দ্রীভূত করা হয়।
  • রোবোটিক বাহুর সাহায্যে অত্যন্ত দ্রুত, ছোট ছোট পালস আকারে আলট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করা হয়।
  • এর ফলে অতি ক্ষুদ্র বুদবুদ বা ‘মাইক্রোবাবল’ তৈরি হয়, যা বারবার ফুলে ও চুপসে গিয়ে টিউমারের কোষগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয়।
  • এরপর শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) স্বাভাবিকভাবেই সেই মৃত কোষ বা ধ্বংসাবশেষ শরীর থেকে পরিষ্কার করে ফেলে।

চিকিৎসায় স্বীকৃতি ও নতুন দিশা: ইতিমধ্যেই চিকিৎসা জগতে এই প্রযুক্তি সাড়া ফেলেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) যকৃতের (Liver) চিকিৎসায় এই পদ্ধতির অনুমোদন দিয়েছে। এছাড়া, চলতি বছরের জুনে ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্যও তাদের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় এই চিকিৎসা পদ্ধতি চালু করেছে।

আশার আলো, তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে: বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হিস্টোট্রিপসিকে এখনই সব ধরনের ক্যান্সারের চূড়ান্ত বা ম্যাজিক সমাধান হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। চিকিৎসার পর ক্যান্সার ফিরে আসার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার এখনও প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া ফুসফুসের মতো গ্যাসপূর্ণ অঙ্গে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যায় না।

তবে কিডনি ও অগ্ন্যাশয়ের টিউমার নির্মূলে এর প্রয়োগ নিয়ে জোর কদমে গবেষণা চলছে। কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন বা অস্ত্রোপচারের মতো যন্ত্রণাদায়ক ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত পদ্ধতির একটি সম্পূর্ণ নিরাপদ বিকল্প হয়ে ওঠার পথে এই আবিষ্কার যে এক বিশাল মাইলফলক, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *