বাংলার ছোট ব্যবসায় রমরমা নাকি অশনি সঙ্কেত? নতুন রিপোর্টে মিলল বড় তথ্য

বাংলার ছোট ব্যবসায় রমরমা নাকি অশনি সঙ্কেত? নতুন রিপোর্টে মিলল বড় তথ্য

কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রকের (MoSPI) সাম্প্রতিক রিপোর্ট ‘Unincorporated Sector at the District Level: Insights from ASUSE 2025’ অনুযায়ী, দেশের অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রে ছোট ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের বিস্তারে বাংলা শীর্ষস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা এই সমীক্ষায় দেশের জেলাভিত্তিক অর্থনীতির এক নতুন চিত্র সামনে এসেছে।

উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাফল্য ও অস্বস্তি

রিপোর্ট বলছে, অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রে দেশের সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠানের জেলা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা। শুধু তাই নয়, এই ধরনের সংস্থায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যাতেও দেশের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে এই জেলা। উত্তর ২৪ পরগনায় এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬.৫৯ লক্ষ এবং সেখানে কাজ করেন ২১.৩ লক্ষ মানুষ। পিছিয়ে নেই দক্ষিণ ২৪ পরগনাও; সেখানে অসংগঠিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০.২৯ লক্ষ এবং কর্মরত মানুষের সংখ্যা ১২.৪ লক্ষ।

তবে পরিসংখ্যানের অন্য পিঠে রয়েছে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। এই দুই জেলায় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবং কর্মসংস্থান বিপুল হলেও, প্রতি প্রতিষ্ঠানের মোট মূল্য সংযোজন বা GVA তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। উত্তর ২৪ পরগনায় প্রতি প্রতিষ্ঠানে GVA ১.৫৯ লক্ষ টাকা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ১.৬২ লক্ষ টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর অর্থ হল বাংলায় ছোট ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের বিস্তার বড় হলেও, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান গড়ে অর্থনীতিতে যে নতুন মূল্য যোগ করছে, তা গুজরাতের সুরতের মতো জেলার তুলনায় বেশ কম। অর্থাৎ, এটি ছোট প্রতিষ্ঠানের কম উৎপাদনশীলতার ইঙ্গিত দেয়।

দেশজুড়ে অসংগঠিত অর্থনীতির আসাম চিত্র

সমীক্ষা অনুযায়ী, অসংগঠিত অ-কৃষি ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশের সমস্ত জেলায় সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অসংগঠিত প্রতিষ্ঠান থাকা ১০টি জেলা ছড়িয়ে রয়েছে প্রধানত চারটে রাজ্যে—গুজরাত, তেলঙ্গানা, উত্তরপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ। দেশের মাত্র ১৬টি জেলায় ৫ লক্ষের বেশি অসংগঠিত অ-কৃষি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে একাই ৮টি জেলা পশ্চিমবঙ্গের।

অন্যদিকে, কম প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও উচ্চ উৎপাদনশীলতার দারুণ উদাহরণও রয়েছে। যেমন, গুজরাতের সুরাতে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮.৫১ লক্ষ এবং কর্মরত মানুষের সংখ্যা ১৭.৪ লক্ষ হলেও, সেখানে প্রতি প্রতিষ্ঠান-পিছু GVA ৪.৩৯ লক্ষ টাকা। আবার পুদুচেরির মাহে জেলায় মাত্র ২,৮৫৬টি প্রতিষ্ঠান থাকলেও, প্রতি প্রতিষ্ঠানের GVA ৫১.৪৭ লক্ষ টাকা। মহারাষ্ট্রের সাতারাতেও প্রতিষ্ঠান-পিছু GVA ১৫.৭৯ লক্ষ টাকা, যা বাংলার জেলাগুলির তুলনায় অনেক বেশি।

মহিলা কর্মসংস্থান এবং জেলাভিত্তিক বিস্তৃতি

অসংগঠিত ক্ষেত্রের এই রিপোর্টে মহিলাদের কর্মসংস্থান নিয়ে আশাব্যঞ্জক তথ্য রয়েছে। দেশের ২৩৭টি জেলায় এই ক্ষেত্রে মোট কর্মীর অন্তত এক-তৃতীয়াংশই মহিলা, যা প্রমাণ করে যে গ্রামীণ ও শহুরে অর্থনীতিতে মহিলা কর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, MoSPI-এর এই প্রথম দেশব্যাপী জেলা-ভিত্তিক সমীক্ষা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে কোনও অঞ্চলের অর্থনীতির আসল শক্তি বিচার করা যায় না। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বা GVA-র মতো সূচকগুলিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *