মাত্র ১ জন ছাত্রীর জন্য ঘন জঙ্গল পেরোন শিক্ষক! চিতা-ভাল্লুকের ভয় পেরিয়ে অনন্য কর্তব্যনিষ্ঠা

মাত্র ১ জন ছাত্রীর জন্য ঘন জঙ্গল পেরোন শিক্ষক! চিতা-ভাল্লুকের ভয় পেরিয়ে অনন্য কর্তব্যনিষ্ঠা

অধিকাংশ শিক্ষক যেখানে গাড়ি বা গণপরিবহনে চেপে স্বাচ্ছন্দ্যে স্কুলে পৌঁছান, সেখানে এক অনন্য নজির গড়েছেন মহারাষ্ট্রের ৫৫ বছর বয়সি শিক্ষক জীবন মিথারি। হিংস্র বন্যজন্তু, দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা এবং প্রবল বৃষ্টিপাতকে উপেক্ষা করে প্রতিদিন প্রায় ৫ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে তিনি পৌঁছান তাঁর স্কুলে। আর এত ঝুঁকিপূর্ণ লড়াইয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য—মাত্র একজন ছাত্রী!

সহকর্মীদের কটূক্তি ও ১৩ বছরের পথচলা মহারাষ্ট্রের কোলাপুর জেলার গগনবাওয়াদা তালুকের ‘কাওয়ালতেক ধাঙরওয়াড়া’ জেলা পরিষদ স্কুলের শিক্ষক জীবন মিথারি। ২০১৩ সালের ২৬ জুলাই তিনি প্রথম এই স্কুলে যোগ দেন। একসময় সহকর্মীদের কাছে তাঁকে শুনতে হয়েছিল, প্রভাবশালী শিক্ষকরা সবসময় সুগম ও সুবিধাজনক এলাকায় পোস্টিং পান, আর সাধারণদের পাঠানো হয় দুর্গম এলাকায়। এই কথাটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে তিনি নিজেই ইচ্ছে করে এই পাহাড়ি এলাকার স্কুলে বদলি নিয়ে আসেন। সেই থেকে আজ টানা ১৩ বছর ধরে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিষেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

১০০ পরিবারের গ্রাম থেকে মাত্র একা ছাত্রী একসময় কাওয়ালতেক ও আনন্দুর ধাঙরওয়াড়া অঞ্চলে প্রায় ৭০ থেকে ১০০টি পরিবার বসবাস করত এবং স্কুলেও যথেষ্ট শিশু পড়ত। কিন্তু জীবিকার খোঁজে ধীরে ধীরে মানুষ শহরমুখী হওয়ায় গ্রামটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে স্কুলটির রেজিস্টারে নাম রয়েছে কেবল স্বরা বোডকে নামের এক তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রীর। তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা একজন হলেও নিজের দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ জীবনবাবু।

প্রতিপদে চিতার ভয় ও বিদ্যুৎহীন অঞ্চল সিন্ধুদুর্গ সীমান্ত সংলগ্ন এই কাওয়ালতেক গ্রামে না রয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ, না রয়েছে গাড়ি চলাচলের উপযোগী রাস্তা। মূল সড়ক থেকে আড়াই কিলোমিটার ভেতরের এই স্কুলে যাতায়াতে প্রতিদিন মোট ৫ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয় তাঁকে। ঘন জঙ্গলে ঘেরা রাস্তায় প্রায়শই চিতাবাঘ ও বুনো মোষের (গউর) দেখা মেলে। বনদপ্তর থেকে তাঁকে কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যেন পথের মাঝে তিনি কোথাও না থামেন। আশপাশের ১১ কিলোমিটারের মধ্যে অন্য কোনো স্কুল না থাকায় এই একমাত্র ছাত্রীর ভবিষ্যৎ গড়ার সমস্ত ঝুঁকি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি।

২০২৯ সালের মে মাসে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার কথা এই কর্মবীর শিক্ষকের। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই অনন্য নিষ্ঠা বজায় রেখে সমাজের কাছে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করে চলেছেন জীবন মিথারি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *