শাস্ত্র ছেড়ে হাতে অস্ত্র! কীভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটল নাগা সন্ন্যাসীদের?

শাস্ত্র ছেড়ে হাতে অস্ত্র! কীভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটল নাগা সন্ন্যাসীদের?

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সম্প্রতি নাগা সাধুদের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের কৌতুহল বাড়িয়ে দিয়েছে। মাথায় দীর্ঘ জটা, গায়ে ভস্মের প্রলেপ আর বস্তুগত বন্ধনহীন এই সাধু সম্প্রদায় কেবল কুম্ভ বা গঙ্গাসাগরেই সীমাবদ্ধ নন; সনাতন ধর্ম ও সমাজ রক্ষায় তাঁরা ঐতিহাসিক ভাবে সশস্ত্র সেনাদলের ভূমিকাও পালন করেছেন।

অস্ত্র ধারণ ও ‘আখড়া’ ব্যবস্থার উৎপত্তি সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য প্রথম হিন্দু সন্ন্যাসীদের সংঘবদ্ধ করেন। পরবর্তীতে সন্ন্যাসী সম্প্রদায় দুটি ধারায় বিভক্ত হয়—শাস্ত্রধারী (আধ্যত্মিক চর্চাকারী) এবং অস্ত্রধারী (সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত)।

মুঘল আমলে সন্ন্যাসীদের ওপর আক্রমণ বাড়লে পণ্ডিত মধুসূদন সরস্বতী সম্রাট আকবর ও বীরবলের পরামর্শে অ-ব্রাহ্মণদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সংগঠিত করেন। জন্ম নেয় ‘আখড়া’ ব্যবস্থা (যেমন—মহানির্বাণ আখড়া) এবং শুরু হয় ‘শৈব শস্ত্র’ (তলোয়ার, ত্রিশূল, বল্লম) চালনার চর্চা। পরবর্তীতে ঔরঙ্গজেবের সময়ে বারাণসী রক্ষা করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন নবাব বা জমিদারদের প্রাইভেট আর্মি এবং ১৮৮০ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নাগা সাধুদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ভূমিকা ছিল।

নাগা সন্ন্যাসী হওয়ার ৪টি মূল ধাপ ইচ্ছে করলেই কেউ নাগা সাধু হতে পারেন না। এই কঠিন প্রক্রিয়ার মূল ধাপগুলো হলো:

  • পরীক্ষা ও সেবা (৬-১২ বছর): আখড়ায় যোগ দেওয়ার পর প্রথমেই দীক্ষা মেলে না। ৬ থেকে ১২ বছর গুরুদের সেবা ও কঠোর ব্রহ্মচর্য পালনের মাধ্যমে সাধকের মনের বৈরাগ্য পরীক্ষা করা হয়।
  • আত্ম-পিণ্ডদান: পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সাধককে জীবিত অবস্থাতেই নিজের শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করতে হয়। অর্থাৎ, সামাজিক ও পারিবারিক ভাবে নিজের ‘মৃত্যু’ ঘোষণা করে তিনি নতুন আত্মিক জীবনে প্রবেশ করেন।
  • চূড়ান্ত দীক্ষা: আখড়ার পতাকার নিচে ২৪ ঘণ্টা অনাহারে দাঁড়িয়ে সাধনা করার পর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে কাম ও সামাজিক বাসনা সম্পূর্ণ বিসর্জন দিতে হয়। (উল্লেখ্য, নারীদের ক্ষেত্রেও কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে ‘মহিলা নাগা সাধ্বী’ হওয়ার বিধান রয়েছে, তবে তাঁরা সেলাইহীন একখণ্ড গেরুয়া বস্ত্র ব্যবহার করেন।)
  • কঠোর জীবনযাপন: দীক্ষাশেষে লোকালয় থেকে দূরে একবেলা আহার, মাটিতে শয়ন এবং গায়ে ছাই মেখে চরম আবহাওয়ায় তপস্যা করাই তাঁদের জীবন। মেলা বা বিশেষ উৎসব শেষে তাঁরা পুনরায় হিমালয়ের গুহা কিংবা মূল আখড়ায় ফিরে গিয়ে সাধনায় মগ্ন হন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *