৩ কোটিতে মিলছে MD ডিগ্রি! ৪ বছরের শিশুর মৃত্যুতেই ফাঁস বিশাল ‘ভুয়ো ডাক্তার’ কেলেঙ্কারি
পূর্ব বর্ধমান: ৪ বছরের শিশু অরণ্য রায়ের করুণ মৃত্যু উসকে দিল রাজ্যের চিকিৎসা ব্যবস্থার এক কদর্য রূপ। গত ২ সেপ্টেম্বর ‘ফাইমোসিস’ অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসায় গাফিলতিতে শিশুটির মৃত্যু হয়। সেই ঘটনার তদন্তে নামতেই সামনে আসে চোখ কপালে তোলার মতো তথ্য— অভিযুক্ত প্রধান চিকিৎসক শেখ সায়দুল হক প্রকৃতপক্ষে একজন ভুয়ো ডাক্তার!
টাকার বিনিময়ে মিলছিল ডাক্তারি ডিগ্রি: অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকলেও কেবল কোটি কোটি টাকার জোর থাকলেই মিলছিল ডাক্তারি ডিগ্রি। এমডি রেডিওলজির মতো উচ্চ ডিগ্রি পেতে গুঁজতে হতো ৩ কোটি টাকারও বেশি। একই সঙ্গে মাস্টার অফ সার্জারি বা অর্থোপেডিকের ডিগ্রিও বিকোচ্ছিল খোলা বাজারে। প্রবেশিকা পরীক্ষায় একজনের হয়ে অন্যজনের পরীক্ষা দেওয়া থেকে শুরু করে মেডিক্যাল কলেজের সিট বিক্রি— পুরো চক্রটিই সক্রিয় ছিল দীর্ঘদিন ধরে।
বিহারের জাল সনদে বাংলায় চিকিৎসা: ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোম’ (APHN)-এর সংগৃহীত তথ্যে জানা যায়, পূর্ব বর্ধমানের তালিতের শেখ সায়দুল হক ও উত্তর ২৪ পরগনার জুলফিকার মণ্ডল বিহার মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভুয়ো শংসাপত্র দেখিয়ে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল থেকে রেজিস্ট্রেশন হাতিয়ে নেন। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল ইতিমধ্যেই তদন্তের পর সায়দুল হক, জুলফিকার মণ্ডল, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ইউনুস হাসান, উত্তম মাইতি ও হাফিজুর হালদার— এই পাঁচজনের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করেছে।
ডাক্তার গড়ার কারিগরও সায়দুল! সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, বর্ধমানের একাধিক নার্সিংহোমে প্র্যাকটিস করার পাশাপাশি তালিতের একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে নতুন চিকিৎসক তৈরির দায়িত্বেও যুক্ত ছিলেন এই সায়দুল! অর্থাৎ, যাঁর নিজের শংসাপত্রই ভুয়ো, তিনিই শেখাচ্ছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞান।
প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ ও সিআইডি তদন্তের দাবি: ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এপিএইচএন (APHN)-এর রাজ্য সভাপতি রাজীব পাণ্ডে ঘটনার সিআইডি তদন্ত ও ভুয়ো ডাক্তার ধরতে সরকারি হেল্পলাইন চালুর দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, পূর্ব বর্ধমানের জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক জয়রাম হেমব্রম জানিয়েছেন, জেলার সমস্ত বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে নোটিস দিয়ে সায়দুল হককে চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১৫ বছরের নথি ফের যাচাইয়ের নির্দেশ: জালিয়াতির শিকড় কতটা গভীর, তা খতিয়ে দেখতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল। ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্য রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বা বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে নাম নথিভুক্ত করেছেন, তাঁদের সমস্ত শংসাপত্র পুনরায় যাচাই করার কড়া নির্দেশ জারি করা হয়েছে।