ভুলে যাওয়া মানেই কি অ্যালঝাইমার্স? জানুন ডিমেনশিয়ার লক্ষণ ও ব্রেন সুস্থ রাখার উপায়
বয়স বাড়লে চশমাটা কোথায় রেখেছেন ভুলে যাওয়া কিংবা পরিচিত কারও নাম মনে করতে না পারা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এই সামান্য ভুলে যাওয়াই যখন দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করে, তখন তা আর সাধারণ বিষয় থাকে না। বিশ্ব অ্যালঝাইমার্স দিবসে জেনে নেওয়া জরুরি— ডিমেনশিয়া ও অ্যালঝাইমার্স ঠিক কী, এর লক্ষণ এবং আক্রান্ত রোগীর পরিবারের লড়াই কতটা কঠিন।
পরিসংখ্যান কী বলছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত, যার মধ্যে শুধুই ভারতে রয়েছে প্রায় ৮৮ লক্ষ। প্রতি ৩.২ সেকেন্ডে বিশ্বে একজন নতুন ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনুমান করা হচ্ছে, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা পৌঁছবে ১৪ কোটিতে।
ডিমেনশিয়া ও অ্যালঝাইমার্স: আসল ফারাক কোথায়? অনেকেই ডিমেনশিয়া ও অ্যালঝাইমার্সকে একই রোগ মনে করেন। কিন্তু নিউরোসাইকায়াট্রিস্টদের মতে—
- ডিমেনশিয়া (Dementia): এটি কোনো একক রোগ নয়, বরং স্মৃতিশক্তি ও চিন্তাশক্তি হ্রাস পাওয়ার একটি সার্বিক উপসর্গ (Umbrella Term)।
- অ্যালঝাইমার্স (Alzheimer’s): এটি মূল রোগ, যা ডিমেনশিয়ার প্রধান কারণ। ডিমেনশিয়া আক্রান্ত রোগীদের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই ভবিষ্যতে অ্যালঝাইমার্সে রূপ নেয়।
মস্তিষ্কের কোষে ‘অ্যামিলয়েড’ (Amyloid) ও ‘টাউ’ (Tau) নামক প্রোটিন জমা হয়ে স্নায়ুকোষ নষ্ট করে দেয় এবং ব্রেন সঙ্কুচিত হতে শুরু করে। এর ফলেই স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে থাকে।
রোগের প্রাথমিক লক্ষণ:
- সাম্প্রতিক ঘটনা বা পরিচিত মানুষের নাম পুরোপুরি ভুলে যাওয়া।
- কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া।
- দিন, তারিখ বা সময়ের হিসাব গুলিয়ে ফেলা।
- পরিচিত পথ ভুলে যাওয়া এবং হঠাৎ আচরণে পরিবর্তন আসা।
পরিবারের ৫টি বড় লড়াই: অ্যালঝাইমার্স শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো পরিবারকে এক মানসিক ও আর্থিক পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।
১. অচেনা প্রিয়জন: বাবা, মা বা সঙ্গী যখন নিজের সন্তান বা জীবনসঙ্গীকেও আর চিনতে পারেন না, তা পরিবারের সদস্যদের মানসিক ভাবে ভেঙে দেয়। ২. নিরাপত্তার চিন্তা: সময় ও স্থানের বোধ না থাকায় রোগী কখন দরজা খুলে বেরিয়ে যান বা রান্নাঘরে দুর্ঘটনা ঘটান— সেই ভয়ে ২৪ ঘণ্টা পাহারা দিতে হয়। ৩. সানডাউনিং সিন্ড্রোম (Sundowning Syndrome): বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে চঞ্চলতা, ভয়, সন্দেহ ও মেজাজ হারানোর প্রবণতা দেখা যায়, ফলে রাতে ঘুম বাড়ে না। ৪. একই কথার পুনরাবৃত্তি: দিনে ৫০ বার একই প্রশ্ন করা কিংবা খেয়ে উঠেও ‘খেতে দিইনি’ দাবি করার মতো পরিস্থিতিতে ধৈর্য বজায় রাখা কঠিন পরীক্ষা। ৫. কেয়ারগিভারদের বার্নআউট: একটানা সেবা করতে করতে পরিবারের মানুষগুলো নিজেরাও বিষণ্ণতা ও তীব্র শারীরিক ক্লান্তিতে ভোগেন।
পরিচর্যাকারীদের করণীয় ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ: অ্যালঝাইমার্স পুরোপুরি নিরাময়ের চিকিৎসা এখনও মেলেনি, তবে ওষুধ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন দিয়ে এর গতি শ্লথ করা যায়।
- তর্ক নয়, সহানুভূতি: বিখ্যাত বাচিকশিল্পী মীর আফসার আলি নিজের বাবার ডিমেনশিয়া ও পার্কিনসন্সের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে জানান, রোগীদের জোর করে বোঝাতে যাওয়া উচিত নয় যে তারা স্বাভাবিক আচরণ করছেন না। তাদের মেজাজ বা আচরণে বদল এলে তা লঘু করে না দেখে ভালোবেসে পাশে থাকা জরুরি।
- মানসিক প্রস্তুতি: মনোবিদদের মতে, কেয়ারগিভারদের নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রিয় মানুষটি কাছে থেকেও নেই— এই অনুভূতি থেকে যে একাকীত্ব তৈরি হয়, তা সামলাতে পরিবারের অন্যান্যদের এগিয়ে আসতে হবে।
বয়স্ক সদস্যদের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ বা স্মৃতিভ্রমের লক্ষণ দেখা দিলে ফেলে না রেখে শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।