‘সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে আপস করতে হয়েছিল, কেউ যেন রাজনৈতিক আদর্শের জন্য কর্মহীন না হয়’ টেকনিশিয়ানস স্টুডিয়োয় পরমব্রতর বিস্ফোরক মন্তব্য
রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যখন টলিপাড়া থেকে শুরু করে বিনোদন জগতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক বিরাট রদবদল ও ওলটপালট চলছে, ঠিক তখনই টলিউডের অন্দরের এক অলিখিত ও রুদ্ধশ্বাস ‘চাপের রাজনীতি’ নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন অভিনেতা-পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। বুধবার কলকাতার টেকনিশিয়ানস স্টুডিয়োয় (Technicians Studio) আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সিনেমা জগতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং শিল্পীদের ওপর আসা মানসিক ও পেশাদারি চাপ নিয়ে নজিরবিহীনভাবে সরব হলেন তিনি।
পরমব্রতর এই অকপট স্বীকারোক্তি ও কড়া বার্তা টলিপাড়ার অলিন্দ ছাপিয়ে এখন রাজ্য রাজনীতিতেও এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
‘প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার এ রকম পরিস্থিতি যেন আর না তৈরি হয়’
বৈঠকে নিজের জীবনের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্তের কথা স্মরণ করে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় জানান, কীভাবে পেশাগত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং পরিবারের কথা ভেবে অতীতে তাঁকে এক চরম আপস করতে হয়েছিল। নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ কণ্ঠে তিনি বলেন:
“আমার সদ্যোজাত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে এক সময়ে চরম আপস করতে হয়েছিল আমাকে…। ভবিষ্যতে প্রকাশ্যে এসে ক্ষমা চাওয়ার এ রকম পরিস্থিতি যেন আর কখনও কোনো শিল্পীর সাথে না তৈরি হয়।”
তিনি আরও যোগ করেন, স্টুডিও পাড়ায় বা কাজের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা বা মতবিরোধ তৈরি হলে তা যেন বয়কট বা কেরিয়ার ধ্বংসের পথে না গিয়ে সামনাসামনি বসে আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়া হয়।
জয় শ্রীরাম হোক বা লাল সেলাম— রাজনৈতিক আদর্শের জন্য কাউকে কর্মহীন করা যাবে না
রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার আসার পর যখন বিভিন্ন সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে, তখন টলিপাড়ায় কোনো ধরণের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বা রঙ দেখে কাজ দেওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক মেগা বার্তা দিয়েছেন পরমব্রত। তিনি স্পষ্ট করে দেন, সিনেমা বা অভিনয়ের জগৎ সবার জন্য উন্মুক্ত এবং এখানে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মেরুকরণ বা দলবাজি চলা উচিত নয়।
কড়া ভাষায় পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় স্পষ্ট জানান:
“এখানে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলবেন, কেউ ‘জয় বাংলা’, কেউ ‘লাল সেলাম’, আবার কেউ বলবেন ‘বন্দেমাতরম’… যার যার নিজস্ব রাজনৈতিক বা সামাজিক আদর্শ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই আদর্শ বা স্লোগানের ভিত্তিতে কাউকে যেন কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া না হয়, কাউকে যেন কর্মহীন করে না দেওয়া হয়।”
সোহমের প্রাণনাশের হুমকির পর পরমব্রতর এই বয়ান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ
বিনোদন মহলের একাংশের মতে, পরমব্রতর এই বক্তব্য বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। একদিকে যখন বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক তথা অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীকে রাজ্য পালাবদলের দোহাই দিয়ে ১৫ লক্ষ টাকা ফেরত চাওয়া এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় টলিপাড়া উত্তাল, ঠিক তখনই পরমব্রতর এই ‘কর্মহীন না করার’ আর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত জমানায় যেভাবে কোনো কোনো শিল্পীকে বামপন্থী বা দক্ষিণপন্থী ভাবাদর্শের কারণে কোণঠাসা করার অভিযোগ উঠত, নতুন জমানাতেও যাতে সেই একই ‘বয়কট সংস্কৃতি’ (Boycott Culture)-র পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্যই আগেভাগে স্টুডিও পাড়ার এই মেগা বৈঠকে সুর চড়ালেন পরমব্রত। এখন দেখার, তাঁর এই বিস্ফোরক বার্তার পর টলিপাড়ার বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং নতুন শাসক শিবিরের পক্ষ থেকে কী প্রতিক্রিয়া আসে।