গাড়ির ট্যাঙ্কি থেকে যুদ্ধজাহাজ— সব চলত এই ৭ কো ম্পা নির ইশারায়! জানুন ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর কাহিনী

গাড়ির ট্যাঙ্কি থেকে যুদ্ধজাহাজ— সব চলত এই ৭ কোম্পানির ইশারায়! জানুন ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর কাহিনী

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে প্রায় তিন দশক বিশ্ব অর্থনীতির চাবিকাঠি ছিল মাত্র সাতটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের হাতে। তেলের খনি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের যানবাহনের জ্বালানি ট্যাংক পর্যন্ত সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হতো এদের ইশারায়। ইতালীয় তেল সংস্থা ‘ইএনআই’-এর প্রধান এনরিকো ম্যাটেই এই প্রভাবশালী গোষ্ঠীটিকে ‘সেভেন সিস্টার্স’ বা ‘সাত বোন’ নামে অভিহিত করেছিলেন। মূলত ১৯৪০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ তেল সম্পদের ওপর এই কো ম্পা নিগুলোর একচেটিয়া অধিকার ছিল।

কারা ছিল এই সেভেন সিস্টার্স

তৎকালীন সময়ে বিশ্ব বাজারে রাজত্ব করা এই সাতটি কো ম্পা নির পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

  • স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অফ নিউ জার্সি (Esso): যা বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল কো ম্পা নি ‘এক্সন’ (Exxon) নামে পরিচিত।
  • রয়্যাল ডাচ শেল: একটি ডাচ-ব্রিটিশ যৌথ উদ্যোগ, যা আজও জ্বালানি খাতে শীর্ষস্থানে রয়েছে।
  • অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কো ম্পা নি (APOC): আধুনিক বিশ্বে আমরা একে ‘বিপি’ (British Petroleum) নামে চিনি।
  • স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অফ নিউ ইয়র্ক (Socony): পরবর্তীতে এর নাম হয় ‘মবিল’। বর্তমানে এটি এক্সন-এর সাথে যুক্ত হয়ে ‘এক্সন-মবিল’ হিসেবে পরিচিত।
  • স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অফ ক্যালিফোর্নিয়া (Socal): বর্তমানের বিশ্বখ্যাত কো ম্পা নি ‘শেভরন’।
  • গালফ অয়েল: পরবর্তী সময়ে এই কো ম্পা নিটি শেভরন-এর সাথে একীভূত হয়ে যায়।
  • টেক্সাকো: এটিও শেভরন-এর সাথে একীভূত হয়ে তার একক অস্তিত্ব হারায়।

যেভাবে চলতো এদের একচ্ছত্র রাজত্ব

‘সেভেন সিস্টার্স’-এর ক্ষমতা এতটাই প্রবল ছিল যে, কোন দেশ কতটুকু তেল উত্তোলন করবে এবং তার বাজারমূল্য কত হবে, তা এরাই নির্ধারণ করে দিত। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে বিপুল তেল মজুদ থাকলেও তা উত্তোলনের প্রযুক্তি এবং বিশ্ব বাজারে পৌঁছে দেওয়ার মতো অবকাঠামো ছিল না। এই সুযোগে সাতটি কো ম্পা নি নিজেদের মধ্যে জোটবদ্ধ হয়ে নতুন কোনো প্রতিযোগীকে বাজারে ঢুকতে বাধা দিত। তৎকালীন সময়ে বলা হতো, এই কো ম্পা নিগুলোর অনুমতি ছাড়া বিশ্বের কোথাও একটি পাতাও নড়ে না, কারণ সারা বিশ্বের পরিবহন ব্যবস্থা এবং সেনাবাহিনী ছিল তাদের তেলের ওপর নির্ভরশীল।

ওপেকের উত্থান ও একাধিপত্যের অবসান

সেভেন সিস্টার্স-এর একচেটিয়া মুনাফা এবং খনিজ সমৃদ্ধ দেশগুলোকে নামমাত্র লভ্যাংশ দেওয়ার নীতি ধীরে ধীরে ক্ষোভের জন্ম দেয়। এই অসন্তোষ থেকেই ১৯৬০ সালে গঠিত হয় ‘ওপেক’ (OPEC)। সৌদি আরব, ইরান, ইরাক, কুয়েত এবং ভেনিজুয়েলার মতো দেশগুলো বুঝতে পারে যে নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। ১৯৭৩ সালের বিশ্ব তেল সংকটের সময় যখন এই দেশগুলো সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন থেকেই সেভেন সিস্টার্স-এর একাধিপত্যে ফাটল ধরে। অনেক দেশ ‘সৌদি আরামকো’-র মতো নিজস্ব জাতীয় তেল কো ম্পা নি গঠন করতে শুরু করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও বাজার বিশ্লেষণ

বর্তমানে সেই পুরনো ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর কাঠামো আর নেই। পারস্পরিক একীভূতকরণের ফলে এই সাতটি কো ম্পা নি এখন সংখ্যায় আরও কমে এসেছে। আজ তারা অনেক বেশি শক্তিশালী হলেও বাজার এখন আর একক কোনো গোষ্ঠীর হাতে নেই। বর্তমান বিশ্ব বাজারে এই পুরনো জায়ান্টদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত কো ম্পা নিগুলো এবং সৌদি আরামকোর মতো দানবীয় প্রতিষ্ঠান।

একঝলকে

  • সংজ্ঞা: ১৯৪০-৭০ দশকে বিশ্ব তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সাতটি বৃহৎ কো ম্পা নির নাম ‘সেভেন সিস্টার্স’।
  • নামকরণ: ইতালীয় তেল বিশেষজ্ঞ এনরিকো ম্যাটেই এই শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।
  • আধিপত্য: বিশ্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ তেল সম্পদ একসময় এদের দখলে ছিল।
  • পতন: ১৯৬০ সালে ওপেকের (OPEC) জন্ম এবং ১৯৭৩-এর তেল সংকটের ফলে এদের একচেটিয়া আধিপত্য শেষ হয়।
  • বর্তমান: অধিকাংশ কো ম্পা নি বর্তমানে একীভূত হয়ে এক্সন-মবিল ও শেভরন-এর মতো বড় গ্রুপে রূপান্তরিত হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *