হাইকোর্টের কড়া ধমক: ৮ মাস পর মিলল ছাত্রীর কঙ্কাল, থানার ২৮ পুলিশকর্মী বরখাস্ত!

ঝাড়খণ্ডের বোকারো জেলার পিন্ডরাজোরা থানার ঘটনাটি আজ দেশের বিচারবিভাগ এবং পুলিশি ব্যবস্থার গাফিলতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ আট মাস ধরে নিখোঁজ থাকা ১৮ বছর বয়সী কলেজছাত্রী পুষ্পা মাহতোর রহস্যজনক অন্তর্ধানের কিনারা হলো অবশেষে। তবে পুলিশের স্বতঃস্ফূর্ত তদন্তে নয়, বরং ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং সশরীরে উপস্থিত হওয়ার আল্টিমেটামের চাপে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধার হলো ছাত্রীর কঙ্কাল। এই ঘটনায় অপরাধীর সঙ্গে যোগসাজশ এবং গাফিলতির অভিযোগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন পুলিশ সদস্যকে একসঙ্গে সাময়িকভাবে বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা
২০২৫ সালের ২১ জুলাই। বোকারোর খুন্তাদিহ গ্রামের পুষ্পা মাহতো ১০ কিলোমিটার দূরে চাস-এর কলেজের উদ্দেশ্যে সাইকেল নিয়ে বের হন। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলেও তিনি আর ফেরেননি। পুষ্পার মা রেখা দেবী ঘটনার দিনই থানায় ছুটে গেলেও পুলিশ তাকে ফিরিয়ে দেয়। অভিযোগ উঠেছে যে, নিখোঁজ হওয়ার ১৩ দিন পর অর্থাৎ ৪ আগস্ট অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মানব পাচারের ধারায় এফআইআর (FIR) দায়ের করে পুলিশ। যদিও শুরু থেকেই পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী যুবক দিনেশ মাহতোর ওপর সন্দেহের কথা জানানো হয়েছিল, কিন্তু পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে ছেড়ে দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা চালায়।
আদালতের হস্তক্ষেপ এবং নাটকীয় মোড়
দীর্ঘ ছয় মাস পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ব্যর্থ হয়ে পুষ্পার বাবা-মা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ মার্চের মধ্যে আদালত তিনবার পুলিশ সুপার হরবিন্দর সিংকে ভর্ৎসনা করেন। এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারকে হয়রানির অভিযোগ ওঠায় ঝাড়খণ্ডের ডিজিপিকেও তলব করা হয়। আদালতের কড়া হুশিয়ারির পর গঠিত হয় স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (SIT)।
এসআইটির তদন্তে যা উঠে এল:
- ১১ এপ্রিল সকালে মূল অভিযুক্ত দিনেশ মাহতোকে গ্রেপ্তার করা হয়।
- জেরার মুখে দিনেশ স্বীকার করে যে, সে পুষ্পাকে হত্যা করে জঙ্গল এলাকায় ফেলে দিয়েছিল।
- গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কলেজ থেকে ১ কিমি দূরে জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় পুষ্পার কঙ্কাল।
- ঘটনাস্থল থেকে হত্যার অস্ত্র (ছুরি), অপরাধীর কাপড় এবং ২৩টি মোবাইল সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়েছে।
পুলিশ-অপরাধী ‘পার্টি’ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
তদন্তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এসআইটি প্রধান অলোক রঞ্জন জানান, আগের তদন্তকারী দল অভিযুক্ত দিনেশকে বাঁচানোর জন্য তথ্যপ্রমাণ দুর্বল করে দিয়েছিল। জেলা পুলিশ সুপারের মতে, পিন্ডরাজোরা থানার পুলিশ কর্মীরা অপরাধীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন এবং এমনকি তার সঙ্গে পার্টিও করেছেন। এই দুর্নীতির দায়ে ১০ জন সাব-ইন্সপেক্টর, ৫ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর, ২ জন হাবিলদার এবং ১১ জন কনস্টেবলকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
একঝলকে
আদালতের ভূমিকা: হাইকোর্টের কড়া ধমক ও আল্টিমেটামের পর মাত্র ২ দিনে সমাধান।
নিখোঁজ কাল: ২১ জুলাই ২০২৫ থেকে দীর্ঘ ৮ মাস।
উদ্ধার: ১১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে পুষ্পা মাহতোর কঙ্কাল উদ্ধার।
মূল অভিযুক্ত: প্রতিবেশী যুবক দিনেশ মাহতো (গ্রেপ্তার)।
কারণ: বিয়ে ঠিক হওয়ার আক্রোশে উত্ত্যক্ত করা ও পরে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
পুলিশি ব্যবস্থা: পিন্ডরাজোরা থানার মোট ২৮ জন পুলিশ কর্মীকে বরখাস্ত।