শিশুদের যকৃতেও মেদের থাবা, ভারতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ফ্যাটি লিভার

শিশুদের যকৃতেও মেদের থাবা, ভারতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ফ্যাটি লিভার

এক সময় মনে করা হতো লিভারে চর্বি জমার সমস্যা কেবল বড়দের বা মদ্যপায়ীদের রোগ। কিন্তু বর্তমান পরিসংখ্যান দিচ্ছে এক ভয়াবহ সংকেত। ভারতে শিশুদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ। ২০২১ সালের একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ওজনের শিশুদের মধ্যে ১২ শতাংশ এই সমস্যায় ভুগছে। অন্যদিকে, স্থূল বা অতিরিক্ত ওজনের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই নিঃশব্দ ঘাতক ব্যাধি শিশুদের লিভার সিরোসিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কেন বাড়ছে শিশুদের লিভারে মেদ

চিকিৎসকদের মতে, আধুনিক জীবনযাত্রা এবং পরিবর্তিত খাদ্যাভ্যাসই শিশুদের এই রোগের প্রধান কারণ। মূলত তিনটি বিষয় লিভারে মেদ জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে:

  • অত্যধিক স্ক্রিন টাইম: মোবাইল, ট্যাব বা ভিডিও গেমে আসক্তির কারণে শিশুদের শারীরিক পরিশ্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
  • ভুল খাদ্যাভ্যাস: প্যাকেটজাত খাবার, অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত প্রসেসড ফুড এবং চিনিযুক্ত পানীয় বা কোল্ড ড্রিংকস খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
  • কায়িক শ্রমের অভাব: দৌড়ঝাঁপ বা খেলাধুলার সুযোগ কমে আসায় শরীরে মেদ জমছে, যা সরাসরি লিভারের কর্মক্ষমতা নষ্ট করছে।

সতর্ক হওয়ার জরুরি লক্ষণসমূহ

ফ্যাটি লিভারের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট উপসর্গ থাকে না। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে অভিভাবকদের অবিলম্বে সতর্ক হতে হবে:

১. পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরেও শিশুর মধ্যে অনবরত ক্লান্তি দেখা দেওয়া।

২. পেটের ডানদিকের ওপরের অংশে ভারি ভাব বা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করা।

৩. ঘাড়ের পেছনে, বগলে বা ঠোঁটের চারপাশে কালো মখমলের মতো দাগ (অ্যাকান্থোসিস নিগ্রিক্যানস), যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ইঙ্গিত দেয়।

৪. ডায়েট করার পরেও ওজন না কমা বা হঠাৎ করে অস্বাভাবিক ওজন বৃদ্ধি।

৫. মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া বা মানসিক অবসাদ।

প্রতিরোধের উপায় ও জীবনযাত্রা পরিবর্তন

ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্তির প্রধান চাবিকাঠি হলো লাইফস্টাইলে আমূল পরিবর্তন আনা। চিকিৎসকরা শিশুদের সুস্থ রাখতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:

  • নিয়মিত ব্যায়াম: শিশুদের প্রতিদিন অন্তত ৬০ মিনিট আউটডোর গেমস বা দৌড়ঝাঁপ নিশ্চিত করতে হবে।
  • খাদ্যতালিকার পরিবর্তন: চিনিযুক্ত পানীয় পুরোপুরি বর্জন করে টাটকা ফলের রস ও পর্যাপ্ত জল খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে। খাবারে ফাইবার সমৃদ্ধ সবজি ও আস্ত দানাশস্য যোগ করা জরুরি।
  • স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ: টেলিভিশন বা স্মার্টফোনের ব্যবহার কমিয়ে সৃজনশীল কাজে শিশুদের ব্যস্ত রাখা প্রয়োজন।
  • ডাক্তারি পরীক্ষা: সন্দেহ হলে নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট (LFT) বা আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে লিভারের অবস্থা যাচাই করা উচিত।

একঝলকে

  • ভারতে স্থূল শিশুদের ৬০ শতাংশই ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত।
  • লক্ষণ হিসেবে ঘাড়ের কালো দাগ বা ক্লান্তি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
  • অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং প্রসেসড ফুড এই রোগের মূল কারণ।
  • প্রতিদিন ১ ঘণ্টা খেলাধুলা লিভার সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
  • অবেহলা করলে ভবিষ্যতে লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *