কোমায় আচ্ছন্ন স্বামী, সন্তানের আশায় বীর্য সংরক্ষণের দাবি নিয়ে হাইকোর্টে স্ত্রী!

চিকিৎসাবিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে এক আবেগঘন ও আইনি জটিলতাপূর্ণ পরিস্থিতির সাক্ষী হলো ভারতের দিল্লি হাইকোর্ট। দীর্ঘ সময় ধরে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা স্বামীর বীর্য সংগ্রহের অনুমতি চেয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন এক নারী। এই ঘটনাটি একদিকে যেমন পিতৃত্বের অধিকারের প্রশ্ন সামনে এনেছে, অন্যদিকে আইনি জটিলতাকেও করে তুলেছে ঘনীভূত।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও আইনি লড়াই
গত ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকে দিল্লির এক ব্যক্তি কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এবং বর্তমানে তিনি লাইফ সাপোর্টে আছেন। এই পরিস্থিতিতে ওই ব্যক্তির স্ত্রী তার স্বামীর বীর্য (Sperm) সংরক্ষণের জন্য দিল্লি হাইকোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করেছেন। আবেদনকারী নারীর উদ্দেশ্য হলো, ভবিষ্যতে আইভিএফ (IVF) পদ্ধতির মাধ্যমে নিজের স্বামীর সন্তানের জন্ম দেওয়া।
আদালতে আবেদনকারীর যুক্তি
আবেদনকারীর আইনজীবী অর্জিত গৌর আদালতে জানান যে, বীর্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন। দেরি হলে নমুনার গুণমান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা ওই নারীর মাতৃত্বের স্বপ্নকে চিরতরে ম্লান করে দিতে পারে। আবেদনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে:
একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে বর্তমান শারীরিক অবস্থায় বীর্য সংগ্রহ করা কতটা নিরাপদ তা যাচাই করা।
আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডক্টর শিবানি সচদেবের পরামর্শ অনুযায়ী, ‘ফাইন নিডল’ পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি টেস্টিকেল থেকে বীর্য সংগ্রহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংগৃহীত নমুনা মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ছোট ছোট ভায়ালে সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগী কোমায় থাকলেও বীর্যের গুণগত মান সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে।
জটিলতার কেন্দ্রবিন্দু ও সুপ্রিম কোর্টের গাইডলাইন
এই মামলাটি আইনি দিক থেকে বেশ স্পর্শকাতর। ২০২১ সালের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী, বীর্য সংগ্রহের জন্য স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই পূর্ব সম্মতির প্রয়োজন হয়। এমনকি স্বামী মৃত হলেও যদি আগে থেকে অনুমতি দেওয়া থাকে, তবেই বীর্য সংগ্রহ সম্ভব। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে স্বামী সম্পূর্ণ অচেতন থাকায় তার পক্ষ থেকে কোনো সম্মতি দেওয়া সম্ভব নয়। এই আইনি মারপ্যাঁচের কারণেই বিষয়টি অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করেছে।
প্রভাব ও বিশ্লেষণ
এই ঘটনাটি ব্যক্তিগত আবেগ এবং কঠোর আইনি সীমানার মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। যদি আদালত এই অনুমতি প্রদান করে, তবে ভবিষ্যতে এই ধরণের ‘প্রক্সি কনসেন্ট’ বা প্রতিনিধির মাধ্যমে সম্মতির ক্ষেত্রে এটি একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। অন্যদিকে, সম্মতি ছাড়া প্রজননগত উপাদান সংগ্রহের নৈতিকতা নিয়েও বিতর্কের সুযোগ থেকে যাচ্ছে। আদালত আগামী বৃহস্পতিবার এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।
একঝলকে
স্বামী ২০২৫ সালের মার্চ থেকে কোমায় এবং লাইফ সাপোর্টে আছেন।
স্ত্রী তার স্বামীর বীর্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছেন।
আইভিএফ প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দিতে চান ওই নারী।
মেডিকেল বোর্ড গঠন করে সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের ‘পূর্ব সম্মতি’ সংক্রান্ত গাইডলাইনের কারণে মামলাটি আইনিভাবে চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।