নিজে খুঁড়লেন গর্ত, নিজেই পড়লেন! হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ‘সেল্ফ গোল’, বিপাকে বিশ্ব অর্থনীতি

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল বাণিজ্য পথ হোরমুজ প্রণালীতে ইরান নিজেদের পাতা মরণফাঁদে নিজেরাই আটকা পড়েছে। শত্রু দেশের জাহাজ ঠেকাতে সমুদ্রের তলদেশে হাজার হাজার মাইন (Sea Mines) বিছিয়েছিল তেহরান। কিন্তু এখন সেই মাইনগুলোই তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই স্ট্র্যাটেজিক ভুলের কারণে ইরান এখন শুধু রাজনৈতিক চাপের মুখেই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পরিকল্পনাহীন রণকৌশল ও বর্তমান পরিস্থিতি
নিজেদের সুরক্ষার জন্য নেওয়া ইরানের এই পদক্ষেপ এখন তাদের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:
- মানচিত্রহীন মাইন: গত মার্চ মাসে যুদ্ধের তীব্রতা থাকাকালীন ইরান তড়িঘড়ি করে হোরমুজ প্রণালীর বিশাল এলাকাজুড়ে ছোট নৌকার মাধ্যমে হাজার হাজার মাইন নিক্ষেপ করে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মাইনগুলো ঠিক কোথায় কোথায় রাখা হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট ‘মিলিটারি ম্যাপ’ ইরানের কাছে নেই।
- স্রোতের কবলে স্থান পরিবর্তন: পারস্য উপসাগরের সমুদ্র স্রোত অত্যন্ত শক্তিশালী। ম্যাপ না থাকায় এবং তীব্র স্রোতের কারণে মাইনগুলো তাদের আদি স্থান থেকে মাইলের পর মাইল দূরে সরে গেছে। সমুদ্রের বিশাল গভীরে এই মাইনগুলো খুঁজে বের করা এখন খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- প্রযুক্তির অভাব: সমুদ্রের তলদেশ থেকে মাইন শনাক্ত ও অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক সোনার (Sonar) এবং আন্ডার ওয়াটার রোবটিক প্রযুক্তি ইরানের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর প্রভাব
ইরানের এই ‘সেলফ গোল’ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি করেছে। এর প্রভাবগুলো অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী:
- আটকা পড়েছে হাজারো জাহাজ: মাইনের ভয়ে হোরমুজ প্রণালীতে বর্তমানে প্রায় ১,০০০-এর বেশি তেলের ট্যাঙ্কার আটকা পড়ে আছে। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এই পথ দিয়েই হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
- ইরানের নতুন টোল নীতি: প্রধান পথ বিপজ্জনক হয়ে পড়ায় ইরান ‘লারাক দ্বীপ’ সংলগ্ন একটি সংকীর্ণ বিকল্প পথ ব্যবহার করতে বলছে। তবে শর্ত হলো, সেই পথে ইরানি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে জাহাজ চালাতে হবে এবং বিনিময়ে বিশাল অংকের ‘টোল’ দিতে হবে। আমেরিকা এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে।
- পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা: যদি কোনো তেলবাহী ট্যাঙ্কার ভুলে এই মাইনে আঘাত করে, তবে লাখ লাখ টন অপরিশোধিত তেল সমুদ্রে ছড়িয়ে পড়বে। এতে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য ও প্রবাল দ্বীপগুলোর এমন ক্ষতি হবে যা কাটিয়ে উঠতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি পরোক্ষভাবে এই সংকট স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, কারিগরি সমস্যার কারণে প্রণালীটি পুরোপুরি উন্মুক্ত করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। এই অচলাবস্থার কারণে ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি আমদানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
একঝলকে
যেকোনো সময় বড় ধরনের সামুদ্রিক পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে।
নিজেদের পাতা মাইনের অবস্থান শনাক্ত করতে পারছে না ইরান।
হোরমুজ প্রণালীতে ১,০০০-এর বেশি তেলের ট্যাঙ্কার আটকা পড়েছে।
বিশ্বের ৩০ শতাংশ তেল সরবরাহ এই সংকটের কারণে হুমকির মুখে।
বিকল্প পথে চলাচলের জন্য চড়া টোল দাবি করছে তেহরান।