“ভোট দেওয়া শুধু অধিকার নয়, আবেগও!” ভোটার তালিকা নিয়ে কমিশনকে কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দোরগোড়ায় ভোটার তালিকায় নাম থাকা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ভোটারদের অধিকারকে কেবল সাংবিধানিক নয়, বরং ‘আবেগীয় অধিকার’ হিসেবে অভিহিত করে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, নির্বাচনের চাপের দোহাই দিয়ে বৈধ ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যপদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
ভোটাধিকার ও সাংবিধানিক সুরক্ষা
আদালতের মতে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে ভোটার তালিকায় নাম থাকা নাগরিকত্বের পরিচায়ক এবং এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নির্বাচনের প্রস্তুতির দোহাই দিয়ে এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা উচিত নয়। ৯ এপ্রিলের মধ্যে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত করার যে সময়সীমা নির্বাচন কমিশন নির্ধারণ করেছে, তার ফলে অনেক ভোটারের আপিল ঝুলে রয়েছে। এই অবস্থায় আদালত স্পষ্ট করেছে যে, নির্বাচনের ডামাডোলের কারণে ভোটারদের মৌলিক অধিকার খর্ব করা সম্ভব নয়।
ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য গৃহীত ‘বিশেষ নিবিড় পর্যালোচনা’ (SIR) প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পদ্ধতিগত ত্রুটি লক্ষ্য করেছে আদালত। শুনানিতে উঠে আসা প্রধান দিকগুলো হলো:
- লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি: পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কমিশন ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা তार्किक অসঙ্গতি নামে একটি নতুন বিভাগ চালু করেছে, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আদালত।
- নথি যাচাইয়ের জটিলতা: বিহারের উদাহরণ টেনে আদালত জানিয়েছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় যাদের নাম ছিল, তাদের নতুন করে নথি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে নিয়মের কড়াকড়ি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
- আপিল প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধতা: ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পর যারা আপিল করেছেন, তাদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়া এবং কমিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ না করার অভিযোগ আমলে নিয়েছে আদালত।
- বিচারবিভাগীয় ত্রুটির সম্ভাবনা: আদালত স্বীকার করেছে যে, বিপুল পরিমাণ নথি যাচাইয়ের সময় কর্মকর্তাদের কাজে অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে। তাই ভুল সংশোধনের জন্য একটি শক্তিশালী আপিল বিভাগ থাকা জরুরি।
নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ও প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গে দুই দফায় (২৩ ও ২৯ এপ্রিল) বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ৪ মে ফল ঘোষণার কথা রয়েছে। এই সময়সীমার মধ্যে ভোটার তালিকা ফ্রিজ বা চূড়ান্ত করে ফেলায় যারা আইনি লড়াই লড়ছেন, তাদের ভোটাধিকার অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই হস্তক্ষেপ ভোটারদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে সাহায্য করবে এবং নির্বাচন কমিশনকে আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে।
একঝলকে
- ভোটার তালিকায় নাম থাকাকে সাংবিধানিক ও আবেগীয় অধিকার বলেছে সুপ্রিম কোর্ট।
- পশ্চিমবঙ্গ ভোটার তালিকায় ‘তार्किक অসঙ্গতি’র নতুন বিভাগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
- ২০০২ সালের ভোটারদের নতুন করে নথি জমা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই বলে আদালতের পর্যবেক্ষণ।
- বিপুল পরিমাণ আবেদন নিষ্পত্তিতে ভুলের সম্ভাবনা এড়াতে শক্তিশালী আপিল ব্যবস্থার ওপর জোর।
- ২৩ ও ২৯ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের ভোট গ্রহণ এবং ৪ মে ফলাফল প্রকাশ।