নিরাপত্তার নামে নিজের ঘরেই কি ঘাতক বসালেন, সিসিটিভি ক্যামেরায় ফাঁস হচ্ছে একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্ত!

বাসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা কর্মস্থলের ওপর নজর রাখতে বর্তমানে সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা একটি অপরিহার্য যন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা প্রমাণ করছে যে, এই যন্ত্রটিই এখন ব্যক্তি স্বাধীনতার জন্য সবথেকে বড় হুমকি হয়ে উঠছে। হ্যাকাররা ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত এই ক্যামেরাগুলো হ্যাক করে সাধারণ মানুষের বেডরুমের দৃশ্য কিংবা নারীদের আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন নয়, বরং সাইবার অপরাধের এক ভয়াবহ জাল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হ্যাকারদের জাল
ভারতের গুজরাট ও মুম্বাইয়ের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। রাজকোটের একটি প্রসূতি হাসপাতালে নারী রোগীদের চিকিৎসাধীন অবস্থার ভিডিও ইউটিউবে ফাঁস হওয়ার পর তদন্তে বেরিয়ে আসে এক বিশাল চক্রের নাম। সাইবার অপরাধীরা মূলত ডিফল্ট পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা ক্যামেরাগুলোর আইপি অ্যাড্রেস সংগ্রহ করে ‘ব্রুট ফোর্স’ অ্যাটাকের মাধ্যমে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পুলিশি অভিযানে দিল্লি, মহারাষ্ট্র ও গুজরাটসহ ২০টি রাজ্যের প্রায় ৫০ হাজার সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করা হয়েছে। এই ফুটেজগুলো টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ৮০০ থেকে ২,০০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছিল। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাইভ ফিড দেখার জন্য সাবস্ক্রিপশন ফি-ও নেওয়া হচ্ছে।
প্রযুক্তির ফাঁদ ও নিরাপত্তার ঝুঁকি
আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো এখন ‘ইন্টারনেট অফ থিংস’ (IoT) প্রযুক্তিতে চলে, যা সরাসরি ক্লাউড স্টোরেজে তথ্য পাঠায়। অনেক সস্তা বা অনিবন্ধিত কো ম্পা নি তাদের সার্ভার বিদেশে রাখে, যা হ্যাকারদের জন্য অনুপ্রবেশ করা সহজ করে দেয়। মুম্বাইয়ের এক ইউটিউবারের বেডরুমে লাগানো ক্যামেরা হ্যাক করে তার পরিবারের ব্যক্তিগত মুহূর্ত ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমাদের অন্দরমহল আর নিরাপদ নয়। এছাড়া সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে বিদেশের সার্ভারে তথ্য পাচারের অভিযোগে সম্প্রতি দিল্লি পুলিশ আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যারা সংবেদনশীল স্থাপনার তথ্য পাচার করছিল।
সুরক্ষায় করণীয় ও সতর্কতা
প্রযুক্তিবিদদের মতে, সিসিটিভি ব্যবহারের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। শোবার ঘর বা বাথরুমের মতো ব্যক্তিগত স্থানে কখনোই ক্যামেরা লাগানো উচিত নয়। এছাড়া ক্যামেরা স্থাপনের পর কো ম্পা নির দেওয়া সাধারণ পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট দেওয়া জরুরি। সস্তা বা নামহীন ব্র্যান্ডের ক্যামেরা ব্যবহারের পরিবর্তে বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড বেছে নিলে হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি কিছুটা কমানো সম্ভব।
এক ঝলকে
- হ্যাকাররা ইন্টারনেট-সংযুক্ত সিসিটিভি হ্যাক করে বেডরুমের ভিডিও টেলিগ্রাম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিক্রি করছে।
- ২০টি রাজ্যের প্রায় ৫০ হাজার ব্যক্তিগত সিসিটিভি ফুটেজ সাইবার অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
- দুর্বল পাসওয়ার্ড এবং বিদেশি সার্ভারে তথ্য জমা হওয়ার কারণে সহজেই হ্যাক হচ্ছে আধুনিক স্মার্ট ক্যামেরাগুলো।
- বিশেষজ্ঞরা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় শোবার ঘরে ক্যামেরা না রাখা এবং নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন।