বিশ্ববাজারে সারের দাম দ্বিগুণ! আসন্ন খরিফ মরশুমে কি তবে চরম সংকটে পড়তে চলেছেন কৃষকরা?

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি আছড়ে পড়ছে কৃষকের জমিতে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সম্প্রতি ইন্ডিয়ান পोटाশ লিমিটেডের (আইপিএল) এক দরপত্রে দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারিতে যে ইউরিয়ার দাম প্রতি টন ৫০৮ ডলার ছিল, এপ্রিলে তা ৮৪ শতাংশ বেড়ে ৯৩৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। আমদানিকৃত সারের এই অগ্নিমূল্য দেশের সার ভর্তুকি বিলকে ২ লাখ কোটি টাকার উপরে নিয়ে যেতে পারে, যা সরাসরি জাতীয় বাজেটে চাপ সৃষ্টি করবে।
হোরমুজ প্রণালী ও সরবরাহ সংকট
বর্তমান এই সংকটের মূলে রয়েছে হোরমুজ প্রণালীর অচলাবস্থা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এই জলপথ বন্ধ থাকায় বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ভারত তার প্রয়োজনীয় ইউরিয়ার ৪০ শতাংশ এবং কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত এলএনজির ৬০ শতাংশ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে সংগ্রহ করে। কাতার ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এখন বিকল্প উৎস হিসেবে ইন্দোনেশিয়া ও মরক্কোর মতো দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে, যেখানে পরিবহন খরচ ও দাম অনেক বেশি।
ঘরোয়া উৎপাদনে ঘাটতি ও আমলহনামার দুশ্চিন্তা
সারের উচ্চমূল্যের পাশাপাশি দেশে গ্যাসের সংকটে ঘরোয়া উৎপাদনও মাসে প্রায় ১০ লাখ টন হ্রাস পেয়েছে। আসন্ন খরিফ মৌসুমের জন্য ১৯৪ লাখ টন ইউরিয়ার বিপরীতে বর্তমানে মজুদ আছে মাত্র ৫৫ লাখ টন। যদিও সরকার ২৫ লাখ টন আমদানির নিশ্চয়তা দিয়েছে, তবে সরবরাহ বিলম্বিত হলে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খরিফ মৌসুম কোনোমতে পার হলেও আসল সংকট দেখা দেবে অক্টোবর-ডিসেম্বরের রবি মৌসুমে।
কৃষিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ও প্রতিকার
সারের এই আকাশচুম্বী দামের ফলে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের পাতে খাবারের দাম বাড়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা সারের দক্ষতা বাড়াতে জিঙ্ক বা বোরন মিশ্রিত ইউরিয়া ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। একই সঙ্গে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বায়ো-ফার্টিলাইজার বা অণুজীব ভিত্তিক সার ব্যবহারের দিকে জোর দেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। সময়মতো সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে প্রান্তিক কৃষকদের জীবিকা চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এক ঝলকে
- দুই মাসে ইউরিয়া সারের দাম টন প্রতি ৫০৮ ডলার থেকে বেড়ে ৯৩৫ ডলারে পৌঁছেছে।
- হোরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে সার ও এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
- গ্যাসের অভাবে দেশীয় উৎপাদন কমায় খরিফ ও রবি মৌসুমে সারের তীব্র ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে।
- সরকারি সার ভর্তুকি ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে।