মন্দিরে না গেলেও আপনি হিন্দু, শবরীমালা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ

কেরলের শবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতী মহিলাদের প্রবেশাধিকার এবং ধর্মীয় প্রথার সাংবিধানিক বৈধতা সংক্রান্ত মামলায় এক তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন ৯ বিচারপতির বৃহত্তর বেঞ্চে শুনানি চলাকালীন আদালত স্পষ্ট জানায়, হিন্দু ধর্ম কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান বা মন্দির দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত একটি জীবনধারা। বেঞ্চের সদস্য বিচারপতি বি.ভি. নাগারত্ন উল্লেখ করেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি নিয়মিত মন্দিরে না যান বা বিশেষ কোনো ধর্মীয় আচার পালন নাও করেন, তবে তাঁর হিন্দু পরিচয় ক্ষুণ্ণ হয় না।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, অনেকের বাসগৃহে পৃথক ঠাকুরঘর বা উপাসনার স্থান না থাকলেও তাঁদের মানসিকতা ও চেতনা হিন্দু হতে পারে। মানুষের এই ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা আধ্যাত্মিক চেতনার মূলে কোনো বাহ্যিক বাধা গ্রহণযোগ্য নয়। মূলত ধর্মীয় চেতনা বনাম প্রাতিষ্ঠানিক আচারের যে দ্বন্দ্ব দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে, এই মন্তব্যের মাধ্যমে তাকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করল দেশের শীর্ষ আদালত।
ধর্মীয় সংস্কার ও সাংবিধানিক অধিকারের লড়াই
শুনানি চলাকালীন আবেদনকারীদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী যুক্তি দেন, সংবিধানের ২৫ ও ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় অধিকার থাকলেও তা কোনোভাবেই লিঙ্গ সাম্য বা মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী হতে পারে না। তাঁর মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার কখনোই ব্যক্তির মৌলিক অধিকারকে খর্ব করতে পারে না। বিপরীতে, আদালত প্রশ্ন তুলেছে যে ১৯৫০-এর দশকে সংবিধান প্রণেতারা যে সভ্যতার ভিত তৈরি করেছিলেন, বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে তা কতটুকু পরিবর্তন করা সমীচীন।
প্রথার বৈধতা ও বিচারবিভাগের সতর্কতা
সুপ্রিম কোর্ট আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, যদি প্রতিটি ধর্মীয় প্রথা বা বিশ্বাসকে আইনি পরীক্ষার মুখে দাঁড় করানো হয়, তবে দেশে মামলার পাহাড় তৈরি হবে এবং ধর্মের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ২০১৮ সালে ৫ বিচারপতির বেঞ্চ শবরীমালা মন্দিরে সব বয়সী মহিলাদের প্রবেশের অনুমতি দিলেও, সেই রায়ের পুনর্বিবেচনার আবেদনগুলি এখন ৯ বিচারপতির বেঞ্চে বিচারাধীন। এই মামলার চূড়ান্ত রায় ভবিষ্যতে ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণের ক্ষেত্রে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। মূলত প্রাচীন প্রথা রক্ষা এবং আধুনিক সাংবিধানিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন শীর্ষ আদালতের প্রধান চ্যালেঞ্জ।