সোনার নেশা কাটানোই কি ভারতের অর্থনীতির রক্ষাকবচ?

ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এক দশকেরও বেশি সময় আগে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় যে কঠোর পথ দেখিয়েছিলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই ‘গোল্ড ডকট্রিন’ বা স্বর্ণ-নীতি যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ২০১২ সালে সোনার আমদানিশুল্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে তিনি যে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, আজকের বিশ্ববাজারে অস্থিরতার মাঝে মোদী সরকারও সেই একই দর্শনের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। মূলত ডলারের বহির্গমন রোধ এবং টাকার মান স্থিতিশীল রাখাই এই নীতির মূল লক্ষ্য।
অনুৎপাদনশীল সম্পদ বনাম জাতীয় অর্থনীতি
প্রণব মুখোপাধ্যায়ের যুক্তিতে সোনা ছিল একটি ‘অনুৎপাদনশীল’ সম্পদ। জ্বালানি তেল বা কলকব্জার মতো সোনা দেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় সরাসরি ভূমিকা রাখে না, অথচ এটি আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। ২০১২ সালে ভারতের চলতি খাতের ঘাটতি (সিএডি) যখন জিডিপি-র ৪.৩ শতাংশে পৌঁছায়, তখন তিনি আমদানিশুল্ক বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ও ডলারের তুলনায় টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ নেন। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে কেবল অলংকারে সীমাবদ্ধ না রেখে ব্যাংক আমানত বা শেয়ার বাজারের মতো উৎপাদনশীল খাতে চালিত করা, যা দেশের শিল্পায়নে সহায়ক হয়।
আধুনিক প্রেক্ষাপট ও নতুন কৌশল
বর্তমান সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে সোনার দাম আকাশছোঁয়া। এই পরিস্থিতিতে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোদী সরকার প্রণব মুখোপাধ্যায়ের দর্শনেরই আধুনিক প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। তবে বর্তমান সরকার কেবল শুল্ক আরোপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং ভৌত সোনার চাহিদা কমাতে ‘সভরেন গোল্ড বন্ড’-এর মতো বিকল্প বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করেছে। এতে বিনিয়োগকারী সোনার দাম বাড়ার সুবিধা পাচ্ছেন, আবার সরকারকে বিদেশ থেকে সরাসরি সোনা আমদানি করতে হচ্ছে না।
তবে উচ্চ আমদানিশুল্কের নেতিবাচক দিক হিসেবে সোনা চোরাচালানের ঝুঁকি থেকেই যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্কের হার অতিরিক্ত বেড়ে গেলে অবৈধ পথে সোনা আসার প্রবণতা বাড়ে। ফলে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। পরিশেষে, ২০১২ থেকে ২০২৬—সময় বদলালেও ভারতের অর্থনৈতিক বাস্তবতা একই রয়েছে। অতিরিক্ত সোনা আমদানি মানেই ডলারের সংকট এবং টাকার অবমূল্যায়ন। এই চক্র ভাঙতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের দেখানো পথটিই আজ ভারতের মুদ্রা ব্যবস্থাপনার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।