আরজি কর কাণ্ডে তিন আইপিএস সাসপেন্ড, তদন্তের আওতায় মমতার ভূমিকাও

আরজি কর কাণ্ডে তিন আইপিএস সাসপেন্ড, তদন্তের আওতায় মমতার ভূমিকাও

আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় কর্তব্যে গাফিলতি এবং প্রমাণ লোপাটের গুরুতর অভিযোগে অবশেষে সাসপেন্ড করা হলো কলকাতা পুলিশের তৎকালীন তিন শীর্ষ আইপিএস আধিকারিককে। শুক্রবার এক তাৎপর্যপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল, ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং ডিসি (নর্থ) অভিষেক গুপ্তকে সাসপেন্ড করার কথা ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন, আরজি কর কাণ্ডের মূল অপরাধের তদন্ত রাজ্য করছে না। তবে ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্টের চেষ্টার যে অভিযোগ উঠেছিল, তার বিভাগীয় ও প্রশাসনিক তদন্ত করা হবে। এই পদক্ষেপের পাশাপাশি ঘটনার সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী ভূমিকা ছিল, তাও খতিয়ে দেখার ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

কাঠগড়ায় বিনীত, ইন্দিরা ও অভিষেকের ভূমিকা

২০২৪ সালের অগস্টে আরজি কর কাণ্ডকে কেন্দ্র করে যখন রাজ্যজুড়ে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তখন থেকেই লালবাজারের এই তিন শীর্ষ কর্তার ভূমিকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছিল।

তৎকালীন পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের বিরুদ্ধে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে নির্যাতিতার নাম প্রকাশ্যে আনা, ১৪ অগস্ট রাতে ‘মেয়েদের রাতদখল’ কর্মসূচির সময় আরজি কর হাসপাতালে দুষ্কৃতী হামলা রুখতে ব্যর্থ হওয়া এবং আন্দোলন দমনে বলপ্রয়োগের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ধৃত সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়ও আদালতে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিল, বিনীত গোয়েল-সহ কয়েকজন পুলিশকর্তা তাকে ফাঁসিয়েছেন।

অন্যতিকে, ডিসি (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সেমিনার হলের স্পর্শকাতর ঘটনাস্থলে বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার দেওয়া এবং সাংবাদিক বৈঠকে প্রকৃত তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করা। আরজি কর হাসপাতাল যে টালা থানার অন্তর্গত, সেটি ডিসি (নর্থ) অভিষেক গুপ্তের অধীনে ছিল। অভিষেকের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করতে দেরি করা, ঘটনাস্থল দ্রুত সুরক্ষিত না করা, তাড়াহুড়ো করে নির্যাতিতার দেহ দাহ করা এবং নির্যাতিতার পরিবারকে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করানোর চেষ্টার মতো মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।

কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, আরজি কর পর্বের পর থেকেই আমজনতা এবং জুনিয়র চিকিৎসকদের মনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। প্রশাসনের শীর্ষস্তরের একাংশের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ লোপাট এবং অপরাধীদের আড়াল করার যে অভিযোগ উঠেছিল, এই সাসপেনশনের সিদ্ধান্ত তারই প্রত্যক্ষ ফলাফল।

এই কড়া পদক্ষেপের ফলে রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনিক স্তরে একটি স্পষ্ট বার্তা গেল যে, কর্তব্যে গাফিলতি বা ক্ষমতার অপব্যবহার বরদাস্ত করা হবে না। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা খতিয়ে দেখার ঘোষণা। এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হতে পারে এবং আরজি কর মামলার প্রশাসনিক তদন্তের পরিধি যে অনেকটাই বিস্তৃত হতে চলেছে, সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *