রাষ্ট্রপতির নির্দেশে বরখাস্ত বিতর্কিত আইএএস পদ্মা জয়সোয়াল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রের কড়া পদক্ষেপ!

রাষ্ট্রপতির নির্দেশে বরখাস্ত বিতর্কিত আইএএস পদ্মা জয়সোয়াল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রের কড়া পদক্ষেপ!

প্রায় দুই দশকের আইনি লড়াই ও বিভাগীয় তদন্তের অবসান ঘটিয়ে চাকরি থেকে অপসারিত হলেন বিতর্কিত আমলা পদ্মা জয়সোয়াল। ২০০৩ ব্যাচের এজিএমইউটি (AGMUT) ক্যাডারের এই আইএএস আধিকারিকের বিরুদ্ধে ওঠা লক্ষ লক্ষ টাকার সরকারি তহবিল তছরুপের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় স্বয়ং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর অপসারণের আদেশনামায় স্বাক্ষর করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কর্মী ও প্রশিক্ষণ বিভাগ (ডিওপিটি) এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের যৌথ সুপারিশের ভিত্তিতে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মোদী সরকার এই কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

টানা ২৩ বছরের প্রশাসনিক কর্মজীবনে দিল্লি, গোয়া, পুদুচেরি এবং অরুণাচল প্রদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন পদ্মা জয়সোয়াল। বরখাস্তের আদেশ জারির আগে তিনি দিল্লি সরকারের প্রশাসনিক সংস্কার বিভাগের শীর্ষ পদে আসীন ছিলেন। কাগজের কলমে তাঁর কর্মজীবন অত্যন্ত সফল মনে হলেও, প্রায় ২০ বছর আগের এক আর্থিক কেলেঙ্কারিই শেষ পর্যন্ত তাঁর পতনের কারণ হয়ে দাঁড়াল।

যে দুর্নীতির কারণে এই চরম শাস্তি

অভিযোগের সূত্রপাত ২০০৭-০৮ সালে, যখন পদ্মা জয়সোয়াল অরুণাচল প্রদেশের পশ্চিম কামেং জেলার ডেপুটি কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলেন। পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (সিবিআই) মামলার দায়িত্ব নিয়ে জানতে পারে, পদ্মা ক্ষমতার জোরে জনগণের জন্য বরাদ্দ তহবিলের প্রায় ২৮ লক্ষ টাকা তছরুপ করেছেন।

তদন্তে উঠে আসে, তিনি তিনটি সরকারি ডিপোজিট অ্যাট কল রিসিট (ডিসিআর) ভাঙিয়ে একাধিক ডিমান্ড ড্রাফট তৈরি করেছিলেন। অভিযোগ, এই বিপুল অর্থ তিনি নিজের নামে না রেখে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে বেনামে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে ব্যবহার করেন। এই গভীর অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে তাঁর তৎকালীন আর্থিক উপদেষ্টা এবং অফিসের ক্যাশিয়ারসহ বেশ কয়েকজন অধস্তন কর্মচারীও জড়িত ছিলেন।

দীর্ঘ আইনি জটিলতা কাটিয়ে আদালতের সবুজ সংকেত

২০০৯ সালে সিবিআই মামলা দায়ের করার পর দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এই প্রক্রিয়াটি আইনি জটে আটকে ছিল। এর আগে কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল (ক্যাট) কারিগরি কারণ দেখিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়ের করা মামলাটি খারিজ করে দিয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের দাবি ছিল, এজিএমইউটি ক্যাডারের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নেই।

ক্যাটের এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় কেন্দ্র। অবশেষে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল দিল্লি হাইকোর্ট ক্যাটের সিদ্ধান্ত বাতিল করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার সবুজ সংকেত দেয়। আদালত স্পষ্ট জানায় যে, পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত ভুল ছিল এবং স্থগিত থাকা বিভাগীয় তদন্ত পুনরায় শুরু করা উচিত। হাইকোর্টের রায়ের পরেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (ইউপিএসসি) দ্রুত তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করে পদ্মাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার চূড়ান্ত সুপারিশ জানায়।

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রভাব

যদিও অতীতে ময়াঙ্ক শীল চহ্বান বা মধ্যপ্রদেশের অরবিন্দ ও টিনু জোশীর মতো আইএএস দম্পতিকে দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত করার নজির রয়েছে, তবুও পদ্মা জয়সোয়ালের এই অপসারণ ভারতের আমলাতন্ত্রে একটি জোরালো বার্তা দিল। প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে যে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও দুর্নীতির অপরাধ থেকে পার পাওয়া সম্ভব নয়। এটি একদিকে যেমন আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনবে। তবে এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলে পদ্মা জয়সোয়াল গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, তিনি এই ধরনের কোনো বরখাস্তের আদেশ সম্পর্কে এখনও অবগত নন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *